গল্পগুলো অন্যরকম – ০১ / আরিফ আজাদ


1f0f2559e2575f71a8e757bb1b7569b5

সূর্যের সোনালী আভা বিধৌত ঝলমলে এক ভোর। ইসলামের একেবারে প্রথম দিককার সময়। নবুয়াত লাভ করে আস্তে আস্তে তাওহ্বীদের বাণী মানুষের কাছে প্রচার করছে এক যুবক। যুবকটির নাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ।
তবে, মক্কা উপত্যকার সকল অধিবাসীদের কাছে এই যুবক অন্য একটি নামে পরিচিত। আল-আমীন। আল-আমীন অর্থ বিশ্বস্ত। তখন মাত্র গুটিকয়েক লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় এসে শামিল হয়েছে। ডর ভয়হীন যুবকটা এই অল্প কয়েকজনকে নিয়েই রোজ বের হয় দাওয়াতের কাজে। লোকজনকে বলতো,- ‘শুনুন! আপনারা যার উপাসনা করছেন, তাদের আদতে কিচ্ছু করার ক্ষমতা নেই। এরা না নিজেরা কিছু শুনে, না কিছু বুঝে। দয়া করে আমার কথা শুনুন। আমার উপর বিশ্বজাহানের র’বের পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশ নাযিল হয়েছে। আমি জানতে পেরেছি, আপনাদের উপাস্য দেবতারা পাথরের মূর্তি বৈ কিচ্ছু নয়। একমাত্র ইলাহ তো আল্লাহ। আপনারা এসব উপাসনা ছেড়ে সেই মহান সত্ত্বার ইবাদাত করুন। তিনি এক, অদ্বিতীয়…….’

সবাই তাঁর কথা শুনে খুব মজা পেলো। বলতে লাগলো,- ‘বলে কী ছোকরা! সেই যুগের পর যুগ ধরে আমরা যাদের উপাসনা করে আসছি তারা নাকি সত্য ইলাহ নয়। আর এই ছেলে এসে বলছে কীনা তার উপরে সত্য প্রত্যাদেশ নাযিল হয়েছে। দু’দিনের বৈরাগী, ভাতেরে কয় অন্ন…..’

সবাই ভাবলো ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু দিন দিন যখন এই ছেলেটার দল ভারি হতে লাগলো, মক্কাবাসীর কপালের ভাঁজ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হতে শুরু করলো। এই ছেলেটাকে তো এভাবে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া যায় না। কী করা যায় তাহলে? 
নষ্ট সমাজের একটি চিরাচরিত নিয়ম হচ্ছে, যখন কেউ ‘শুদ্ধ’ হবার কথা বলে, নষ্টের দল তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার, কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়। 
যুবকটার কপালেও এরকম অনেকগুলো অপবাদ জুটে বসলো। তাকে বলা হলো কবি, উন্মাদ, পাগল, যাদুকর ইত্যাদি। 
কিন্তু, এই ছেলে তো থামার নয়। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, আর এই ছেলের দল ভারি থেকে আরো ভারি হতে থাকে।।

মক্কা তখনও কুরাইশদের দখলে। তখনও ক্বাবা শরীফকে ঘিরে কিছু ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করতো মুশরিকরা। 
পবিত্র ক্বাবা ঘরের চাবি জমা ছিলো এক লোকের কাছে। লোকটা মুশরিক। নাম উসমান ইবনে তালহা।
এক সকালে, মুহাম্মদ (সাঃ) কিছু সাহাবীদের নিয়ে ক্বাবা প্রাঙ্গনে এসে উপস্থিত হলেন। কিন্তু, ক্বাবা ঘরের দরজা তালাবদ্ধ।
মুহাম্মদ (সাঃ) উসমান ইবনে তালহাকে বললেন,- ‘আমাকে ক্বা’বার চাবি দিন। আমি ভিতরে ঢুকবো….’
উসমান ইবনে তালহা অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন,- ‘তোমাকে চাবি দিবো মানে? তুমি না তোমার পিতৃধর্ম ত্যাগ করেছো? তুমিই তো সেই যে এই ক্বা’বার ইলাহকে (ক্বাবার মধ্যে তখন যেসকল মূর্তি ছিলো তাদের উদ্দেশ্য করে) মিথ্যা বলে বেড়াচ্ছো। তোমাকে কখনোই চাবি দিবো না আমি। চলে যাও এখান থেকে….’

মুহাম্মদ (সাঃ) শান্ত গলায় বললেন,- ‘শুনুন! আজকে আমায় চাবি দিচ্ছেন না তো? ঠিক আছে। আজকে আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু একদিন আপনার হাতের ওই চাবি আমার হাতে থাকবে। আর সেদিন আমি যাকে ইচ্ছা এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে দেবো…..’

মুহাম্মদ (সাঃ) এর কথা শুনে উসমান ইবনে তালহা আবারো রেগে গেলেন। বললেন,- ‘শোন মুহাম্মদ, সেদিনটা কখনোই আসবে না। যদি আসেও, সেদিন কোন কুরাইশই অবশিষ্ট থাকবে না।’

মুহাম্মদ (সাঃ) হাসলেন। বললেন,- ‘সে দিনটা অবশ্যই আসবে, এবং কুরাইশরাও বর্তমান থাকবে। সেদিন কুরাইশদের বরং সম্মানিত (ইসলামের মাধ্যমে) করা হবে।’

এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। যেদিন মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কা বিজয় করেন, সেদিন ক্বা’বা চত্ত্বরে এসে তিনি ক্বা’বা শরীফের চাবি খুঁজতে লাগলেন। বলা হলো,- ‘এই চাবির সংরক্ষক উসমান ইবনে তালহা।’
মুহাম্মদ (সাঃ) হজরত আলী (রাঃ) কে বললেন উসমান ইবনে তালহার কাছ থেকে চাবি নিয়ে আসতে। আলী (রাঃ) উনার কাছে গিয়ে চাবি চাইলেন। কিন্তু উসমান ইবনে তালহা নিজ সিদ্ধান্তে অনড়। যেন- মক্কা বিজয় করেছে তো কি হয়েছে। প্রাণ থাকতে এই চাবি আমি মুহাম্মদের হাতে দিবো না।
আলী (রাঃ) কয়েকবার বলার পরেও যখন চাবি পেলেন না, তখন জোর করে উসমান ইবনে তালহার হাত থেকে চাবি নিয়ে আসেন। এনে মুহাম্মদ (সাঃ) এর হাতে দেন। মুহাম্মদ (সাঃ) ক্বা’বা শরীফের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন। ঢুকে সালাত আদায় করলেন। 
তখন, মক্কায় যারা হজ্ব করতে আসতো, তাদের পানি পান করাতো রাসূল (সঃ) এর চাচা আব্বাস (রাঃ)। তিনি বললেন,- ‘হে রাসূল (সাঃ), আপনি কী আজ থেকে মক্কার চাবি সংরক্ষণের দায়িত্বটা আমাকে দিবেন? তাহলে হাজ্বীদের পানি পান করানোর পাশাপাশি আমরা আরো একটি মহান দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য লাভ করতে পারতাম।’

ঠিক সেই মূহুর্তে জিবরাঈল (আঃ) ওহী নিয়ে আসলেন। নাযিল হলো সূরা আন-নিসা’র ৫৮ নম্বর আয়াত।

‘Allah commands you to deliver trusts to those worthy of them; and when you judge between people, to judge with justice’

‘(হে রাসূল) আল্লাহ আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানতসমূহ হক্বদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে, এবং যখন আপনি লোকদের বিচার করেন, তখন অবশ্যই তাদের সাথে ন্যায় বিচার করবেন….’

এই আয়াত নাযিল হয় ক্বা’বা শরীফের চাবি কেন্দ্রিক ঘটনাকে নিয়ে। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন,- ‘আমি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে আজকের (অর্থাৎ সেদিনের) আগে আর কখনোই এই আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনিনি।

এই আয়াতে হক্বদারের কাছে তার আমানত ফেরত দেওয়ার কথা আছে। সে অবস্থায়, উসমান ইবনে তালহা’ই ছিলেন এই চাবির হক্বদার। তাই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আব্বাস (রাঃ) কে সেদিন ক্বা’বার চাবি দেন নি। হজরত আলী (রাঃ) কে বললেন উসমান ইবনে তালহাকে চাবি ফিরিয়ে দিয়ে আসতে।

আলী (রাঃ) উসমান ইবনে তালহার কাছে এসে কাঁচুমাচু করে বললেন,- ‘মাফ করে দাও আমাকে। তোমার হাত থেকে জোর করে আমি চাবি ছিনিয়ে নিয়েছি। এই নাও তোমার চাবি।’

উসমান ইবনে তালহা বিস্মিত হলেন। বুঝতে পারছিলেন না ঘটনা কী। তখন আলী (রাঃ) তৎক্ষণাৎ নাযিল হওয়া আয়াতটি তিলাওয়াত করে শুনালেন উসমান ইবনে তালহাকে।
উসমান ইবনে তালহা এই আয়াতের অর্থ বুঝতে পারলেন খুব ভালো করেই। এরকম উদারতা, ন্যায়বিচার, এবং অন্যের আমানতের প্রতি ইসলামের গুরুত্বারোপ দেখে তিনি বিমুগ্ধ হলেন।
সাথে সাথে তিনি ঘোষণা করলেন,-

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ…..’

‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, এবং মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর প্রেরিত রাসূল।’

সেদিনই উসমান ইবনে তালহা (রাঃ) ইসলামের সুশীতল ছায়ায় শামিল হোন। এবং, এখন পর্যন্ত পবিত্র ক্বা’বা শরীফের চাবি সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন হজরত উসমান ইবনে তালহা (রাঃ) এর বংশধরগন।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in অধিকারীর অধিকার, ইসলাম, গল্প নয় সত্যিই. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s