‘মুজাহীদরা যদি সহীহ পথে থাকে তাহলে বিজয়ী হচ্ছেনা কেন? যেখানে আল্লাহ তা’আলা ওয়াদা করেছেন তিনি মুমিনদের সাহায্য ও বিজয়ী করবেন।


war_and_peace-normal

লিখেছেন – শেখ ফরিদ আলম

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাকল্পে জিহাদকে ফরয করা হয়েছে ইসলামে। আর তাই সারা বিশ্বেই অনেক মুসলিম নেমে পড়েছেন জিহাদের ময়দানে। প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে, শরীয়াহ আইন লাগুর নামে বিক্ষোপ, বিশৃঙ্খলা অতঃপর গৃহযুদ্ধ লেগেছে কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র্বে। জিহাদ ফরয অবশ্যই কিন্তু জিহাদের পরিস্থিতি তৈরি হলে জিহাদ করা এবং জিহাদের পরিস্থিতি তৈরি করে জিহাদ করা নিশ্চয় এক নয়। জিহাদ ও সন্ত্রাস এক নয়। তবে অনেকেই এগুলোকে গুলিয়ে ফেলে। নাস্তিক ও সেক্যুলারদের মুকাবিলা করার নামে ও ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে ইসলামী নেতারা/মুজাহীদরা একে একে যেসব কৌশল নিচ্ছেন, তাতে ইসলামের কল্যাণের চাইতে অকল্যাণ বেশী হচ্ছে। সেই সাথে সাধারণ মুসলমানদের দুর্ভোগ বাড়ছে ও ইসলাম সম্পর্কে বিরোধীদের অপপ্রচারের সুযোগ মিলে যাচ্ছে। ফলে বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ আজ উত্তপ্ত, সারা বিশ্বেই মুসলিমরা অপমানিত, লজ্জিত। সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে অনেক মুসলিম জেল খাটছে, অত্যাচারিত হচ্ছে। চারিদিকে জন্ম হয়েছে অনেক মুজাহীদের। কেউ বলছে এরা সঠিক কাজ করছে আবার কেউ বলছে ভুল। তবে একটা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে জ্ঞানীদের মহলে, ‘মুজাহীদরা যদি সহীহ পথে থাকে তাহলে বিজয়ী হচ্ছেনা কেন? যেখানে আল্লাহ তা’আলা ওয়াদা করেছেন তিনি মুমিনদের সাহায্য ও বিজয়ী করবেন। আসুন সেই ব্যাপারে বিস্তারিত জানি সিরিয়ার প্রতিভাধর কুর’আন ও সহীহ সুন্নাহর অনুসারী আলেম মুহাম্মাদ বিন জামীল যাইনুর লেখা একটি বিখ্যাত বই ‘ফির্কাহ নাজিয়াহ’ থেকে। অবশ্যই হুবহু আমি কপি করছিনা। কিছুটা সংক্ষেপে করার চেষ্টা করেছি। কিছু সংযোজনও করেছি এবং বোঝার সুবিধার জন্য নিজের মতো করে সাজিয়েছি। যাইহোক লেখাটাতে তিনটা ভাগ আছে। বিজয় লাভের শর্তাবলী, মুমিনদের বিজয়ী করা আল্লাহর দায়িত্ব, বর্তমান মুজাহীদরা বিজয়ী হচ্ছেনা কেন?

❝বিজয় লাভের শর্তাবলী❞

মুহাম্মাদ সা. এর জীবন চরিত ও তাঁর জিহাদ বিষয়ক ইতিহাস পাঠ করলে তাঁর জীবনে নিন্মলিখিত পর্যায় দেখতে পাবেন –
তাওহিদের পর্যায় – রাসুল সা. মক্কায় ১৩ বছর অবস্থানকালে আপন সম্প্রদায়কে উপাসনা, প্রার্থনা, বিচার-ভার প্রভৃতিতে আল্লাহর একাত্ববাদের প্রতি এবং শির্কের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতি ততদিন আহ্বান করলেন যতদিনে এই বিশ্বাস তাঁর সহচরদের মন-মূলে সুদৃঢ়ভাবে স্থান করে নিল এবং দেখা গেল যে, তাঁরা এখন নির্ভীক বীরদল রূপে প্রস্তত হয়েছেন যাঁরা আল্লাহ ব্যতীত আর কারো ভয়ে মোটেই ভীত নন। তাই ইসলামের দাওয়াত পেশকারীদের জন্য তাওহীদের প্রতি আহ্বান এবং শির্ক হতে সাবধান করার মাধ্যমেই তাঁদের দাওয়াত আরম্ভ করা ওয়াজেব। যাতে তাঁরা এই কর্মে রাসুল সা. এর অনুসারী হন।

ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন পর্যায় – সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সমাজ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করলেন। সেখানে সর্বাগ্রে তিনি এক মসজিদ নির্মাণ করলেন। যাতে মুসলিমরা ঐ মসজিদে তাদের প্রতিপালকের ইবাদত আদায়ের জন্য সমবেত হতে পারে এবং জীবনকে নিয়মানুবর্তী করার লক্ষ্যে প্রত্যহ পাঁচবার সমাবেশ করার সুযোগ লাভ হয়। অতঃপর শীঘ্রই তিনি মদীনাবাসী আনসার এবং সম্পদ ও গৃহত্যাগী মক্কাবাসী মুহাজেরীনদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন স্থাপন করে দিলেন। এতে আনসারগণ মুহাজেরীনকে তাঁদের নিজস্ব সম্পদ দান করলেন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় যাবতীয় বস্তু তাঁদের সেবায় উতসর্গ করে দিলেন। মদিনাবাসীদের দুটি গোত্র আওস ও খওরজ। তিনি দেখলেন ঐ দুই গোত্রের মাঝে প্রাচীন শত্রুতা বর্তমান। তাই এদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করলেন, তাদের অন্তর থেকে বিদ্বেষ ও বৈরিতা মুছে ফেললেন এবং ঈমান ও তাওহীদে পরস্পর সম্প্রীতিশীল ভাই ভাই রুপে গড়ে তুললেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত, ‘মুসলিম মুসলিমের ভাই ভাই….’।

প্রস্তুতি – শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে কুর’আন মুসলিমকে আদেশ করে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত (সঞ্চয়) কর’ [সুরা আন’ফাল/৬০]। ঐ শক্তির ব্যাখ্যায় রাসুল সা. বলেন, ‘জেনে রাখো, ক্ষেপণই হল শক্তি’ [মুসলিম]। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য যথাসাধ্য অস্ত্র ক্ষেপণ শিক্ষা (আর্মি ট্রেনিং) নেওয়া ওয়াজেব। ইসলামীক রাষ্ট্রেরও উচিত স্কুল কলেজ গুলোতে এই ধরণের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা। যাতে প্রয়োজনে প্রতিটা মুসলিম তার রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে। এবং রাষ্ট্রের উচিত যুদ্ধের জন্য শক্তি প্রস্তুত করা বা অস্ত্র শস্ত্র সঞ্চয় করা।

[এবার একটু ভেবে দেখুন তো আমাদের সমাজের কথা। এই তিনটি বিষয়ের কোনটিও কি ঠিক আছে। তাওহীদের অর্থই তো অনেকে বুঝেনা। দেখা গেল যুদ্ধের ময়দানে পায়ে গুলি খেয়ে বলছে হে খাজাবাবা! হে পীর বাবা! আমারে বাচাঁও। এই রকম আক্বীদার লোকেদের কি আল্লাহ সাহায্য করবেন? আর ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন এর কথা ভাবুন? আমরা কত দলে বিভক্ত। জাপানের ১০ লক্ষেরও বেশি আদিবাসী মাযহাবীদের লড়াইএর কারণে ইসলাম গ্রহণ করেনি। ভারতে ড. আম্বেদকার ৩০ কোটি নিন্মজাতের হিন্দুদের নিয়ে ইসলাম গ্রহন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু এক মাজহাবী দল বলল আমাদের দলে এসো ওরা খারাপ আর আরেক দল বলল আমাদের দলে এসো ওরা খারাপ। আম্বেদকার ভেবেছিলেন ইসলাম ধর্মে জাতপাত নাই তাই তিনি ইসলাম গ্রহন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই দলাদলি দেখে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেন ত্রিশ কোটি হিন্দুদের নিয়ে। প্রস্ততির কথা সবারই জানা। লাঠি নিয়ে বন্দুকের বিরুদ্ধ লড়াই করা জিহাদ নাকি আত্মহত্যা?]

❝মুমিনদের বিজয়ী করা আল্লাহর দায়িত্ব❞

যখন আমরা তাওহীদের বিশ্বাসের প্রতি সকলে প্রত্যাবর্তন করব, যখন আমরা ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হবো, মুসলিম মুসলিম ভাই হবো, যখন আমরা জিহাদের জন্য সঠিকভাবে প্রস্তুত হবো এবং উপযুক্ত শক্তি সঞ্চয় করবো তখন ইনশাল্লাহ ইনশাল্লাহ বিজয় আসবেই। আমরা এর উদাহরণ দেখেছি ইতিহাসে। যেমন রাসুল সা. এবং তাঁর সাহাবাদের জন্য বিজয় অনিবার্য হয়েছিল।

আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহর (মনোনীত দ্বীন প্রতিষ্ঠায়) সাহায্য কর তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদ সুদৃঢ় করবেন’ [সুরা মুহাম্মাদ/৭]

আল্লাহ আরো বলেন, ‘মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব’ [সুরা রুম/৪৭]

উক্ত আয়াত গুলো থেকে বোঝাই যাচ্ছে আল্লাহ মুমিনদেরকে সাহায্য ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তা এমন এক প্রতিশ্রুতি যার অন্যথা হবেনা। সুতরাং তিনি তাঁর রাসুলকে বদর, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধে বিজয়ী করেছেন। এবং রাসুল সা. এরপর তাঁর সাহা্বাবর্গকে তিনি তাঁদের শত্রুদের উপর বিজয়ী করেছেন। যার ফলে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে, বহু দেশ জয় হয়েছে এবং বিভিন্নমুখী আঘটন ও বিপদ সত্ত্বেও মুসলিমগণ জয়ী হয়েছেন। শেষে শুভ পরিণাম হয়েছে সেই মুমিনদের যাঁরা আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর তাওহীদ, ইবাদত এবং বিপদে ও সুখে তাঁদের প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনাতে সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়েছেন। কুর’আন মাজীদ বদর যুদ্ধে মুমিনদের অবস্থা বর্ণনা করেছে; যখন তাঁদের সংখ্যা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম নিতান্ত নগণ্য ছিল। তাই তাঁরা তাদের প্রভুর নিকট প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘(স্মরণ কর) যখন তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সকাতর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তা মঞ্জুর করেছিলেন (এবং বলেছিলেন) আমি তোমাদের একেরপর এক আগমনরত একসহস্র ফিরিশ্তা দ্বারা সাহায্য করব’ [সুরা আনফাল/৯] আল্লাহ তাদের সেই করুণ নিবেদন শ্রবণ করেছিলেন। তাই তাদের সপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য ফিরিশ্তাদল দ্বারা তাঁদের সাহায্য করলেন। শেষ পর্যন্ত তাওহীদবাদী মুমিনগণ বিজয়ের মর্যাদায় ভুষিত হলেন।

❝বর্তমান মুজাহীদরা বিজয়ী হচ্ছেনা কেন?❞

বর্তমানে আমরা দেখি যে, মুসলিমগণ অধিকাংশ দেশেই তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হচ্ছে বটে, কিন্তু বিজয় লাভ তারা করতে পারেনা। তাহলে এর কারণ কি? মুমিনদেরকে দেওয়া আল্লাহর ওয়াদা কি অন্যথ্যা হয়ে যাচ্ছে? না তা কক্ষনই নয়। আল্লাহর ওয়াদা কখনই ব্যতিক্রম হয়না। কিন্তু আজ কোথায় সে মুসলিমদল যাদের জন্য আয়াতে উল্লেখিত বিজয় আগত হবে।
আমরা মুজাহেদীনদেরকে জিজ্ঞেস করি যে –
◆☛ তারা সেই ইমান ও তাওহীদসহ জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন কি? যে দুই কর্ম দ্বারা রাসুল সা. মক্কায় অবস্থানকালে যুদ্ধের পূর্বকালে নিজের দাওয়াত শুরু করেছিলেন?
◆☛ তারা সেই কারণ ও হেতু (উপায় ও উপকরণ) অবলম্বন করেছে কি? যার আদেশ তাদের প্রতিপালক এই বলে দিয়েছেন – ‘তোমরা (যুদ্ধের জন্য) যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তত (সঞ্চয়) কর’। যে শক্তির ব্যখ্যায় রাসুল সা. বলেন, ‘তা হল ক্ষেপণ’।
◆☛ যুদ্ধের সময় তারা কি আল্লাহর নিকট সকাতর প্রার্থনা করেছে এবং কেবল তাঁরই নিকট সাহায্য ভিক্ষা করেছে? নাকি দু’আতে তাঁর সহিত অপরকেও শরীক করেছে এবং তাদের নিকট বিজয় প্রার্থনা করেছে যাদেরকে তারা আওলীয়া মনে করে থাকে? অথচ তারাও আল্লাহর দাস। যারা নিজেদের ব্যাপারেও ইষ্ট অনিষ্টের মালিক নয়। একমাত্র আল্লাহরই নিকট প্রার্থনা করার বিষয়ে তারা রাসুলের অনুসরণ করে না কেন? ‘আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?’ [সুরা যুমার/৩৬]
◆☛ অবশেষে, তারা কি পরস্পর ঐক্যবদ্ধ ও সম্প্রীতিশীল এবং তাদের আদর্শবাণী কি আল্লাহর এই বাণী? ‘তোমরা আপোসে বিবাদ করো না; নচেত তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের চিত্তের দৃঢ়তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে’ [সুরা আনফাল/৪৬]
◆☛ পরিশেষে একথা বলাই বাহুল্য যে, মুসলিমরা যখন তাদের ধর্মবিশ্বাস এবং দ্বীনের সেই নির্দেশাবলী উপেক্ষা করে বসল, যা শিক্ষা ও সংস্কৃতিমুলক প্রগতির প্রতি ধাবমান হতে আদেশ করে, তখন তারা সকল জাতি হতে পশ্চাদে পড়ে গেল। পুনরায় যখন তারা আপন দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করবে তখনই তাদের উন্নতি ও মান মর্যাদা ফিরে আওবে।
◆☛ অভীষ্ট ইমান বাস্তবায়িত হলে প্রতিশ্রুত বিজয় সুনিশ্চিত হয়ে আসবে। যেহেতু ‘মুমিনদের সাহায্য ও বিজয়ী করার দায়িত্ব আল্লাহ স্বয়ং নিয়েছেন’।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in ইসলাম. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s