বিশ্বনবীর আদর্শ জীবন


শেখ ফরিদ আলম

4-Nature-Wallpapers-2014-1

মুহাম্মাদ (সা.) এমন এক নবী যাঁকে আল্লাহ তা’আলা ‘বিশ্বনবী’ করেছেন । তিনি সারা বিশ্বের সকল মানুষদের জন্য রহমত স্বরুপ । এর আগের নবীগণকে আল্লাহ নির্দিষ্ট জাতি, সম্প্রদায় বা ভূ-খন্ডের জন্য নবী বা ঈশ্বরের দূত করেন কিন্তু মুহাম্মাদকে (সা.) সারা বিশ্বের সকল মানুষ এবং জ্বীন সম্প্রদায়ের নবী করা হয় । মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের নিকট আগমন করেছে তোমাদেরই মধ্যকার এমন একজন রসূল, যার কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় অতি কষ্টদায়ক মনে হয়, যে তোমাদের খুবই হিতাকাঙ্খী, বিশ্বাসীদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুণাপরায়ণ’ (সুরা তাওবা/১২৮)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘আমি তো তোমাকে (নবীজীকে) বিশ্বজগতের প্রতি শুধু করুণা রুপেই প্রেরণ করেছি’ (সুরা আম্বিয়া/১০৭)। এছাড়াও তিনি বলেন, ‘আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরুপে প্রেরণ করেছি ; কিন্তু অতিকাংশ মানুষ তা জানে না’ (সুরা সাবা/২৮)। মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী; তিনি মানুষদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ । তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সবকিছু আমাদের জন্য শিক্ষনীয়, অনুসরণীয় । মহান আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী’ (সুরা ক্বালাম/৪)। তাঁর আদর্শ জীবন থেকে কিছু আপনাদের কাছে পেশ করব ।

  • তিনি উত্তম কথা বলতেন, সালাম প্রচার করতেন এবং মানুষদের খাদ্য দান করতেন । তিনি বলেন, ‘উত্তম কথা বলো নতুবা চুপ থাকো’ (বুখারী)। এছাড়াও বলেন, ‘‘জান্নাত অনিবার্যকারী কর্ম হল, উত্তম কথা বলা, সালাম প্রচার করা এবং অন্ন দান করা’। (ত্বাবারানী, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সঃ তারগীব/২৬৯৯)।

  • তিনি মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন । আল্লাহও সেই কথা কুর’আনে বলেছেন । তিনি উত্তম চরিত্রকে ভালোবাসতেন এবং ঘৃণা করতেন বখাটে, অশ্লীল, অহংকারী লোককে । তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর’ (বুখারী/৬০২৯; মুসলিম/২৩২১)। তিনি আরো বলেন, ‘অবশ্যই সচ্চরিত্রবান ব্যক্তি তার সুন্দর চরিত্রের বলে (নফল) নামাজী ও রোজাদারের মর্যাদায় পৌছে থাকে’ (আহমাদ; আবু দাউদ/৪৮০০)।

  • তিনি ছিলেন আদর্শ স্বামী । তিনি স্ত্রীদের সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করতেন । তিনি বলেছেন, ‘সবার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবার চেয়ে সুন্দর এবং তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি সেই, যে তোমাদের মধ্যে নিজ স্ত্রীদের নিকট উত্তম’। (আহমাদ; তিরমিযী; ইবনে হিব্বান; সহীহুল জামে/১২৩২)

  • তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে উতসাহ দিয়েছেন এবং প্রতিবেশিদের কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন । তিনি বলেন, ‘আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা, সুন্দর চরিত্র অবলম্বন করা এবং প্রতিবেশির সাথে সদ্ব্যবহার রাখায় দেশ আবাদ থাকে এবং আয়ু বৃদ্ধি পায়’ (আহমাদ, সহীহুল জামে/৩৭৬৭)।

  • সকল নবী ও মহাপুরুষদের ন্যায় তিনি ছিলেন নম্র ও বিনয়ী । নিশ্চয়ই এটি সুন্দর চরিত্রের অন্যন্য গুণ । তিনি ছোট-বড়, গরীব-ধনী সকলকেই সন্মান করতেন । একদা এক ব্যক্তি তাঁর সামনে এসে কথা বলতে গিয়ে কাঁপতে শুরু করল । তিনি তাকে সাহস দিয়ে বললেন – ‘প্রকৃতিস্থ হও । আমি তো কোন বাদশা নই । আমি এমন মায়ের পুত, যে (মক্কার বাতহাতে) রোদে শুকানো গোশত খেতো’ (সিঃ সহীহাহ/১৮৭৬)। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে লোক তার সন্মানার্থে দাঁড়িয়ে থাকুক, সে যেন নিজের বাসস্থান জাহান্নামে বানিয়ে নেয়’ (তিরমিযী, আবু দাউদ, সিঃ সহীহাহ/৩৫৭)।

original

  • তিনি তাঁর চাকরের সাথেও উত্তম ব্যবহার করতেন এবং কোন দিন দুর্ব্যবহার করেননি । তাঁর খাদেম আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি দশ বছর পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) –এর খিদমত করেছি । তিনি কখনও আমার জন্য ‘উহঃ’ শব্দ বলেননি । কোন কাজ করে বসলে তিনি একথা জিজ্ঞেস করেননি যে, ‘তুমি এ কাজ কেন করলে?’ এবং কোন কাজ না করলে তিনি বলেননি যে, ‘এ কাজ কেন করলে না?’ (বুখারী/৬০৩৮; মুসলিম/৬১৫১)। এছাড়াও তিনি চাকরদের প্রতি সুব্যবহার করতে আদেশ করেছেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করতে বলেছেন । একজন চাকরদের দিনে কতবার ক্ষমা করব জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন দিনে সত্তর বার ।

  • তিনি ছিলেন সহিষ্ণু ও ক্ষমাশীল । তাঁর সারা জীবনে এর অনেক উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মুর্খ, অজ্ঞানী, অহংকারী, নির্বোধদের বর্বর ব্যবহার ও নিকৃষ্ট সমালোচনায় তিনি সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করেছেন । এমনকি তাদের জন্য দু’আও করেছেন । তায়েফের ঘটনা এর সবথেকে বড় প্রমাণ । তিনি তায়েফবাসীদের অন্ধকার থেকে আলোতে আনতে গেলেন অথচ তারা তার প্রতি কতই না নিকৃষ্ট ব্যবহার করে রাসুলুল্লাহকে রক্তাক্ত করে ছাড়ল । তারপরেও তিনি তাদের উপর বদ্দুয়া করেননি । অথচ তাঁর এক বদ্দুয়াতেই তায়েফ নামের জায়গাটা ধ্বংশ হয়ে যেত ! তিনি বলতেন, ‘আমি অভিশাপকারীরুপে প্রেরিত হইনি । আমি তো করুণারুপে প্রেরিত হয়েছি’ । (মুসলিম/৬৭৭৮)

  • তিনি ছিলেন দয়ার সাগর । তিনি অপরের প্রতি দয়াশীল ছিলেন এবং মানুষকে দয়াশীলতার শিক্ষা দিতেন । তিনি বলতেন, ‘যে দয়া করে না তার প্রতি দয়া করা হয় না’ (বুখারী/৬০১৩; মুসলিম/৬১৭০)। ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করবে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করবেন না’ (বুখারী/৭৩৭৬; মুসলিম/৬১৭২)। তিনি আরো বলতেন, ‘দয়ার্দ্র মানুষদেরকে পরম দয়াময় (আল্লাহ) দয়া করেন । তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করো, তাহলে তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন, যিনি আকাশে আছেন’ (তিরমিযী; সহীহ আবু দাউদ/৪১৩২)।

  • তিনি মানুষকে ভালো বাসতেন । কুশ্রী বা অসুন্দর বলে কাউকে হেয় করতেন না । তিনি গুণ দেখতেন । এক মরুবাসী সাহাবী ছিলেন যাহের (রা.) । তাঁকে নবীজী ভালোবাসতেন । যাহের কুশ্রী ছিলেন । একদা তিনি নিজের পণ্য বিক্রি করছিলেন । এমতাবস্থায় নবী (সা.) তাঁর কাছে এসে তাঁর পিছন থেকে বগলের নিচে হাত পার ক’রে জরিয়ে ধরলেন । (অথবা তাঁর পিছন থেকে জরিয়ে ধরে তাঁর চোখ দুটিতে হাত রাখলেন)। যাতে তিনি দেখতে না পান । যাহের বললেন, ‘কে? আমাকে ছেড়ে দিন’। অতঃপর তিনি লক্ষ্য করলেন বা বুঝতে পারলেন, তিনি নবী (সা.) । সুতরাং নিজের পিঠকে ভালোভাবে তাঁর (অপার স্নেহময়) বুকে লাগিয়ে দিলেন । নবী (সা.) বললেন, ‘কে গোলাম কিনবে?’ যাহের বললেন, ‘আল্লাহ কসম! আমাকে সস্তা পাবেন!’ (একথা শুনে) নবীজী বললেন, ‘কিন্তু তুমি আল্লাহর কাছে মুল্যবান’। (আহমাদ; আবু ইয়্যালা; মিশকাত/৪৮৮৯)।

  • তিনি লোকেদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতেন । এবং তাঁর সাথে কারও সাক্ষাত হলেই তাকে তিনি হাসি মুখে বরণ করতেন । যেমন, জারীর বিন আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) যখনই আমাকে দেখতেন, তখনই মুচকি হাসতেন’ (বুখারী/৩০৩৫; মুসলিম/৬৫১৯)। নবী (সা.) বলতেন, ‘কল্যাণমুলক কোন কর্মকেই অবজ্ঞা করো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত করেও হয়’ (মুসলিম/৬৮৫৭)।

  • তিনি উপহার বিনময় করতেন এবং একে অপরকে উপহার দিতে নির্দেশ দিয়েছেন । তিনি বলেছেন, ‘তোমরা উপহার বিনিময় কর, পারস্পারিক সম্প্রীতি লাভ করবে’ (বাইহাক্বী; সহীহুল জামে/৩০৮)। তিনি আরো বলেন, ‘হে আমার সন্তানগণ! তোমরা আপোসে (উপঢৌকন) বিনিময় কর, যেহেতু তা তোমাদের আপোসে বেশি সম্প্রীতিকর’। (আল আদাবুল মুফরাদ/৫৯৫)।

  • তিনি দান করতে উতসাহ দিয়েছেন । এবং এই দানের ক্ষেত্রে ধর্মের ভেদাভেদ রাখেননি । তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সকল ধর্মের মানুষদেরকে দান কর’। (ইবনে আবী শাইবা; সিঃ সহীহাহ/২৭৬৬)।

  • তিনি পশুপাখিদের প্রতি ছিলেন দয়াশীল । একদা তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘হে আল্লাহর রাসুল! চতুষ্পদ জন্তুর প্রতি দয়া প্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যা! প্রত্যেক জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনে নেকি রয়েছে’ (বুখারী/২৪৬৬; মুসলিম/২২৪৪)। একবার এক সাহাবী উঠকে পানি পান করালে নেকি হবে কিনা জিজ্ঞেস করলে নবীজী বলেন, ‘হ্যা, প্রত্যেক পিপাসার্ত প্রানী (কে পানি পান করানো) তে সওয়াব আছে’ (সহীহ ইবনে মাজাহ/২৯৭২; বাইহাক্বী)।

  • তিনি সমাজসেবামুলক কাজ যেমন কুয়া খুড়া, গাছ লাগানো, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো ইত্যাদি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন । তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুয়া খুঁড়বে, যে কুয়া থেকে কোন পিপাসার্ত জীব, জ্বীন, মানুষ অথবা পাখি পানি পান করলেই কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাকে সওয়াব দান করবেন’ (বুখারী তারীখ, ইবনে খুযাইমা, সঃ তারগীব/৯৬৩)।

  • তিনি মানুষ সম্পর্কে বলতেন, ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক তারা, যাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য তাদের তোয়ায করা হয়’ (আবু দাউদ; সহীহুল জামে/৭৯২৩)। তিনি আরো বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ হল সেই ব্যক্তি, যে অপরের সাথে মিশতে পারে এবং অপরেও তার সাথে মিশতে পারে’ (সহীহুল জামে/১২৩১)।

unnamed

  • সৎ ভাবে উপার্জন নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ উপার্জন যদিও তা অল্প হয় এবং সেই কাজকে সমাজ ছোট কাজ বলে । তিনি বলতেন, ‘সর্বাপেক্ষা উত্তম উপার্জন হল সৎ ব্যবসা এবং নিজের হাতের মেহনত’ (আহমাদ; সহীহুল জামে/১১২৬)। তিনি আরো বলতেন, ‘স্বহস্তে উপার্জন করে যে খায়, তার চাইতে উত্তম খাদ্য অন্য কেউ ভক্ষন করে না…’। (বুখারী/২০৭২)

  • শিক্ষা ছাড়া কোন সমাজই উন্নতি করতে পারে না । তিনি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন । তিনি বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ এবং নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ বা আবশ্যকীয়’ (ইবনে মাজাহ) ।

    এরকম হাজারো শিক্ষা আমরা নবীজীর জীবন থেকে পায় । তারমধ্যে মাত্র কিছু জিনিস তুলে ধরলাম । সংক্ষিপ্ত লেখায় সব তুলে ধরা সম্ভবও নয় । যারা নবী জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তাদের জন্য কয়েকটা বইয়ের কথা জানিয়ে রাখছি । প্রথমেই বলব সফিউর রহমান মুবারকপুরির আর রাহিকুল মাখতুম । এটি সারা বিশ্বে খুব বিখ্যাত । নবী জীবনি লেখার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল এই বই । আব্দুল হামিদ মাদানীর মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ পড়লে জানতে পারবেন কেমন ছিলেন নবীজী এবং কেমন ছিল তাঁর আদর্শ জীবন । এই বই ঠিক গতানুগতিক জীবনি বই নয় । এই বইতে আপনি পাবেন না নবীজীর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কি করেছিলেন তার ব্যাপারে । এই বই থেকে জানবেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) কেমন ছিলেন । তাঁর জীবিকা, দাম্পত্য জীবন, সহজতা, দয়া, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি গুণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। তৃতীয় হল, ড. আসাদুল্লাহ আল গালীবের লেখা নবীদের কাহিনী ৩ । যা মুহাম্মাদ (সা.) –এর সম্পূর্ণ জীবনি ।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in অমুসলিমদের চোখে ইসলাম, আদর্শ মুসলিম ব্যক্তিত্ব, ইসলাম, ইসলাম ও মিডিয়া. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s