চরমপন্থা নিয়ে কিছু কথা…


[লিখেছেন – ইলিয়াস আহমাদ]

চরমপন্থীরা কখনো মিথ্যাবাদী, ধোকাবাজ হয়না । তাদের মধ্যে দলীয় গোরামী বলতে কিছু থাকে না । একটু চিন্তা করুন, যে ব্যক্তি শরীরে বোমা বেধে নিজের জীবন দিয়ে দেয় সে কিন্তু কখনোই দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে এটা করেনা । বুজতে হবে তার মধ্যে কিছু একটা আছে । তা হল অত্যাধিক তাকওয়া, প্রবল ঈমানী চেতনা । একমাত্র জান্নাতের আশায় আল্লাহকে রাজিখুশী করার জন্যই কিন্তু এটা করে । যদিও তার পদ্ধতিটি ভুল ।

এসব বলার কারন একটাই, আমাদের ফেইসবুকে কিছু চরমপন্থী, খারেজী আকীদায় বিশ্বাসীদের ভাইদের স্মরন করিয়ে দেয়া । কারন ফেবুতে এসেই প্রথম জানলাম ও দেখলাম চরমপন্থীরা দলীয় বিদ্বেষের কারনে মানুষের কাছে মিথ্যা প্রচার করছে, অপরের কথার ভুল ব্যাখ্যা করে ধোকাবাজী করছে । কিছুদিন আগে দেখলাম একভাই লিখছে ‘আহলেহাদীছরা নাকি পূর্ববর্তী ফকীহদের গালিগালাজ করে’ । সে নিজেও জানে যে এটা মিথ্যা, তারপরও দলীয় গোরামীর কারনে প্রচার করল আরকি ।

ওনারা বলে বেড়ায় মাদখালী, দরবাড়ী আলেমরা নাকি মুজাহিদদের খারেজী বলে । এখানেও সুন্দর একটা ধোকাবাজি করে । হেতারা (আনসারুল্লাহ, হিযবুত, JMB) নিজেদের জিহাদী মনে করে আর তাই এটা প্রচার করে । অথচ আমরা সবসময় বলে আসছি যারা মুসলমানদের কাফের ফতওয়া দিয়ে হত্যা করে তাদের খারেজি আর যারা ইহুদি খৃষ্টান কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করছে তারাই প্রকৃত মুজাহিদ বলি । জাকির নায়েক বা ডঃ গালিবকে কখনো বলতে শুনেছেন যারা ইরাক আপগানিস্তানে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করছে তারা সন্ত্রাস? কারন সেখানে মুসলমানরা আক্রান্ত, আর এ অবস্থায় জিহাদ ফরয । (জিহাদ নিয়ে অন্যদিন বিস্তারিত লেখব)

তবে হ্যা, যারা JMB মতাদর্শে বিশ্বাসী তারা অবশ্যই খারেজী । আরেক ভাইকে দেখি ইংল্যান্ডে বাস করে সারাদিন শুধু সৌদি শাসককে নিয়া কিলবিল (তাকফির) করে । অথচ কোনদিন ওনার মূখে ওবামা, ক্যামেরনের সমালোচনা শুনি না । এমনকি আমি গ্যারান্টি সহকারে বলতে পারি যদি কোনদিন এই ৩জন থেকে ১জনকে মারার সুযোগ দেয়া হয় উনারে তাহলে সৌদি রাজারেই মারবে । রাসূল ছাঃ ঠিক একই কথা বলেছেন “এরা মুসলিমদের হত্যা করবে আর কাফেরদের ছেড়ে দেবে” ।

আমাদের ফেবু জিহাদীদের মাঝেও এখন সূফীদের মত দলীয় বিদ্বেষ ঢুকে গেছে । একটা সময় ছিল যখন ফিকহি মাসআলা মাসায়েল নিয়ে ফেবুতে তর্ক-বিতর্ক করতাম সূফি মাযহাবীদের (দেওবন্দী, বেরলভী) সাথে, কিন্তু এখন আর করিনা । কারন এরা জন্মগত মিথ্যাবাদী, এরা দলীয়/মাযহাবের কারনে মিথ্যা বলে আর ধোকাবাজী করে । হাদীছেও এসেছে সূফীদের মিথ্যা বলার কথা । ইমাম মুসলিম রহঃ সয়ং বলেছেন “সূফিরা মিথ্যা বলতে চায়নে কিন্তু মিথ্যা তাদের মূখ দিয়ে বেড়িয়ে যায়” ।

কিছুদিন আগে এক দেওবন্দি বুযুর্গ Ask Sumon নোট লিখেছেন “আলবানী কর্তৃক ইমাম বুখারীকে অমুসলিম ঘোষণা” চিন্তা করেন, যিনি সারাজীবন ইমাম বুখারীকে অনুসরন করলেন তিনি নাকি বুখারী রহ কে কাফের বলেছেন । বলুন, কি লাভ এদের সাথে গিয়ে তর্ক করে । তাই এখন আর যাইনা, এসব দেখেও না দেখার ভান করি ।

তারপরেও বর্তমানে দেওবন্দী বেরলভীদের চেয়ে খারেজী আকীদায় বিশ্বাসীদের বেশী ভয়ঙ্কর মনে করি । কারন ঐ সূফীরা হক জেনেও দলীয় গোরামীর কারনে এমন করে কিন্তু যখন কেউ চরমপন্থী হয়ে যায় তার দ্বারা দেশ জাতি পরিবার সবকিছুর ধ্বংশ হতে দেরী হয়না । তখন সে এই পথকেই জান প্রাণ দিয়ে সঠিক মনেকরে আর বাকি সবাইকে কাফের ভাবে এবং হত্যা করতেও দ্বিধা করে না । কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, যদি কেউ খারেজীদের সঠিক ইতিহাস জানে তাহলে কখনোই ঐ পথে পা বাড়াবে না ।

এই পথটা যে কত নির্মম নিষ্ঠুর কঠিন তা বুঝার জন্য স্বাভাবিক বিবেকই যথেষ্ঠ । হযরত উসমান (রাঃ) আলী (রাঃ) কে কারা হত্যা করেছিল ? হত্যাকারী কি কাফের বা অমুসলিম ছিল? না, তারা আপনার আমার মতো কালেমা পড়া মুসলমানই ছিল । তারা উসমান (রাঃ) পেছনেই জামাতে স্বলাত আদায় করত । বিশ্বাস করেন, এই দুই মহান খলীফার মৃত্যু কাহিনী পড়লে আপনার চোখ দিয়ে অটোমেটীক পানি বেড়িয়ে আসবে । মুহতারাম আমীরে জামাআত প্রফেসর ড. আসাদুল্লাহ আল গালিব যখন ২০০৫ এ জেলে গেল তখন শায়খ মুজাফফর ভাই মাসিক আত তাহরীকে ধারাবাহিকভাবে খারেজীদের ইতিহাস লিখেছিলেন । যা পড়ে আমিও কেদেছিলাম ।

হযরত উসমান রাঃ যখন বিদ্রোহীদের ফাদে পড়ে জীবনের সর্বশেষ জুমআর সালাত আদায় করেছিলেন তখন খুতবার সময় তিনি এত এত পরিমান কেদেছিলেন যে জনৈক সাহাবী বলেছেন “আমি এ যাবত কোন মহিলা বা পুরুষকে এভাবে আর কাদতে দেখিনি” তারপর নিজ ঘরে অবরুদ্ধ হয়ে কুরআন পাঠ অবস্থায় স্বস্ত্রীক নির্মমভাবে শহীদ হন ।

খারেজীরা তার গালে চপেটাঘাত করেছিল এবং তিনি পড়ে গেলে আমর ইবনুল হামক নামে এক ব্যক্তি লাফিয়ে উঠে তার বুকে চেপে বসে ও ছয়বার অস্ত্রাঘাতের মাধ্যমে এই মহান খলিফাকে শহীদ করে । এসময় উসমান রাঃ এর মাথাটা কুরআনের পাশে ছিল এবং রক্তের ফিনকি সূরা বাকারাহর ১৩৭ নং আয়াতের (“তোমার জন্য তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহই যথেষ্ট । তিনিই সর্বশ্রোতা, সবজ্ঞ”) উপর পড়েছিল । এসময় হত্যাকারী বলেছিল “আজকের দিনের ন্যায় কোন কাফেরের এত সুন্দর মুখমন্ডল কখনো দেখিনি এবং এরকম অধিক সন্মানীয় কাফেরের বাসস্থানও দেখিনি” ।

হযরত আলী (রাঃ) এর হত্যাকারী আবদুর রহমান মুলজিম ধরা পড়ার পরে বলেছিল, আমি আল্লাহর নিকট ওয়াদা করেছি দুজন নিকৃষ্ট কাফেরকে হত্যা করে জান্নাতুল ফেরদাউস কামনা করব এক আলীকে মেরেছি আর মুআবিয়া কে মারার পর আমাকে হত্যা কর তারপর আমি জান্নাতে যাবো ।

দেখছেন আকীদার অবস্থা? কত বড় মুমিন, কতবড় আল্লাহওয়ালা ? তাদের তাকওয়ার কাছে হযরত উসমান, আলী (রাঃ) কিচ্ছু না । আমি আগেও অনেকবার বলেছি, চরমপন্থীদের শুধু একটাই সমস্যা, তা’হল অতিরিক্ত ফরহেযগারিতা, Ultra তাকওয়া, অতিরিক্ত আবেগ । ঠিক একই ভবিষ্যতবাণী করে গেছেন রাসূল (ছাঃ) যে, শেষ যামানায় কিছু তরুনদের আবির্ভাব হবে যাদের ছালাত কুরআন তেলাওয়াতের কাছে তোমরা নগন্য হবে, কিন্তু এটা তাদের কন্ঠনালী অতিক্রম করবে না । এছাড়া আরো অনেক হাদীছ আছে এই যুবক বয়সীদের ফিতনা নিয়ে । আপনি যদি ঐযুগের চরমপন্থী আর এযুগের চরমপন্থীদের মাঝে তুলনা করেন দেখবেন এরা ঠিক একই আকীদা ও আমলের লোক । মানে এরা তত্‍কালীন খারেজীদের বংশধর বা অনুসারী প্রকৃত ।

এই যে মাজারে বোমা, সিনেমা হলে বোমা, মসজিদে বোমা মারে আপনার কি ধারণা এরা মুসলিমদের মুসলিম মনে করে? অবশ্যই না ।

প্রিয় ভাই আমার, আপনাকে হেয় তুচ্ছ করতে আমি এই লেখা লেখিনি । বুঝার চেষ্টা করুন । কে কাফির আর কে কাফির না এটা আলেমদের উপর ছাড়ুন । অতি আবেগ আর চরমপন্থা পরিহার করে হকপন্থি আলেমদের সংস্পর্শে আসুন । আহলেসুন্নাহ ওয়াল জামআতের বইপুস্তক পড়ুন আরো জানার চেষ্টা করুন । আমরা চাইনা আমাদের কোন ভাইয়ের জীবন অকাতরে ভুল পথে নিঃশেষ হয়ে যাক ।

একটা সহজ প্রশ্ন করি, আপনি কি চান? জাকির নায়েকের মতো জীবনে হাযার হাযার কাফেরকে মুসলিম বানিয়ে, সমাজের কুসংস্কার/ইসলামের ভুল ধারণা দুর করে ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য গনজাগরণ তৈরী করে মরা? নাকি সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে নিন্দিত হয়ে, আপনার কাজের দ্বারা ইসলামের আরো শত্রু বাড়িয়ে, পরিবারের ধ্বংশ করে, জেল খেটে বা বোমার আঘাতে মরা…??? কোন মৃত্যুটা আপনি বেশী পছন্দ করবেন ??

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in আদর্শ মুসলিম ব্যক্তিত্ব, আলোচনা, ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা, ইসলামী রাষ্ট্র, সন্ত্রাসবাদ. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s