গণধর্ষণ এবং ধর্ষণ প্রবণতা নিয়ে একটি ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ


লিখেছেন –   । মুল লেখা এখানে

ভারতের গণধর্ষণ নিয়ে বিশ্বে তোলপাড় হচ্ছে। সেখানে জনগণের ইমোশন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটছে। এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এ-ধরণের সামাজিক ঘটনা নতুন নয়। সম্ভবত মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী হওয়ার কারণে ঘটনাটি লাইম লাইটে এসেছে। গরীব অসহায় নারীরা সেখানে প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে। ইন্ডিয়ান মুভিতে গ্যাং রেইপ বা গণধর্ষণের প্রেক্ষাপট অহরহ দেখানো হয়। দৈনন্দিন জীবনে সচারাচর ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো মূলত ফিল্মে চিত্রায়িত করা হয়। মুভিতে নায়কের আবির্ভাব ঘটিয়ে ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে নায়কের দেখা মিলে না! ইন্ডিয়ান ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালে ২৪,২০৬টি ধর্ষণের ঘটনা থানায় লিপিবদ্ধ করা হয়। ১৯৫৩ সালের তুলনায় ২০১১ সালে ধর্ষণের রিপোর্টিং বেড়েছে শতকরা ৮৭৩.৩ ভাগ! মনে রাখতে হবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা চেপে যাওয়া হয় কেননা ভিক্টিম ন্যায় বিচার পাওয়ার পরিবর্তে সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে গত প্রায় ৬০ বছরে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ল কেন? আগের তুলনায় সমাজে শিক্ষার হার বেড়েছে, এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা, বেড়েছে নারী স্বাধীনতা। পাঁচ দশক আগের তুলনায় সমাজ প্রগতিশীল হয়েছে। কিন্তু তারপরেও ধর্ষণের মতো মানবতা বিরোধী অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে কেন? আমাদের দেশের কেউ কেউ তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন এই ভেবে যে আমরা ইন্ডিয়ার চেয়ে ভাল অবস্থানে আছি। অনলাইনে পাঠকের মন্তব্য থেকে আমার এরূপ ধারণা জন্মেছে।

আমাদের দেশে মানুষের জীবনেরই যেখানে দাম নেই সেখানে ধর্ষণ তেমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়। পত্রিকায় অগুরুত্বপূর্ণ খবর হিসেবে দেখেছি মাত্র একমাসে ভায়ালগাজীপুর রেলস্টেশনে ৪৭ জনের লাশ পাওয়া গেছে। মাত্র কয়েকশ টাকার জন্য যাত্রীকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলা হয়। দুদিন আগেও দুজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারকে মেরে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়। এগুলো সাধারণত টকশোর বিষয় হয় না। সম্ভবত ২০০১ সালে ইয়াসমিন নামের একজন নিরীহ গরীব মেয়েকে পুলিশ ধর্ষণ করে হত্যা করে। রমনা পার্ক বা উসমানী উদ্যানের ভাসমান পতিতারা এইডস নিয়ে ভয় পায় না, ভয় পায় পুলিশকে! মজুরীর পরিবর্তে জোটে হাজতে ঢুকানোর ভয়-ভীতি। পত্রিকার পাতায় প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণজনিত হত্যার খবর আসে। এগুলো আমাদের বিবেককে তেমন নাড়া দেয় না। আমাদের বিবেকের সহ্য ক্ষমতা মনে হয় অনেক বেড়েছে! অনেক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবিরা সামাজিক এসব সমস্যার মূলে শুধুমাত্র অশিক্ষা ও দারিদ্র্যকে দায়ী করে। এর সবক হিসেবে বাতলে দেন প্রগতিশীলতার প্রেসক্রিপশন। আবার এর সাথে অনেকে বলেন আইনের কঠোর প্রয়োগই হচ্ছে ধর্ষণ প্রতিরোধের হাতিয়ার। আসলেই কি তাই? আইনের যথাযথ প্রয়োগ, আধুনিক শিক্ষা ও প্রগতিশীলতা কি বাস্তবিকই ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধকে প্রতিরোধ করতে পারে? আসুন উন্নত বিশ্বের দিকে নজর দেয়া যাক যেখানে আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত এবং শিক্ষার আলোয় আলোকিত।

পশ্চিমা বিশ্বের প্রগতিশীল সমাজে ধর্ষণের তথ্যচিত্র:

গতবছর আমেরিকার টেক্সাসে মাত্র ১১ বছরের বালিকাকে ১৮ জন কিশোর গণধর্ষণ করার অভিযোগ পত্রিকায় এসেছে। ২০০৮ সালের হিসেব অনুযায়ী ৯০,০০০ ধর্ষণের ঘটনা পুলিশকে রিপোর্ট করা হয়। এর মাত্র ২৫%-কে গ্রেফতার করা হয়। স্বনামধন্য RAINN (Rape, Abuse and Incest National Network) তথ্য অনুযায়ী আমেরিকায় প্রতি দু’মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হন। প্রতিবছর ২০৭,৭৫৪ জন ধর্ষিত হয় যার ৯৯% নারী। ধর্ষণ সংক্রান্ত ঘটনার প্রায় ৫৪% পুলিশকে রিপোর্ট করা হয় না। ভিকটিম নারীদের ৪৪ ভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে এবং ধর্ষণকারী পুরুষের গড় বয়স ৩১ বছর। এই ধর্ষণকারীদের শতকরা ৫২ ভাগ হচ্ছে সাদা আমেরিকান। আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন Sexual assult statistics.

উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়/স্কুল/কলেজের ধর্ষণের চিত্র:

২০-২৫% নারীরা ধর্ষিত হন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পড়াকালীন সময়ে। এসব ঘটনার ৬৫% পুলিশকে রিপোর্ট করা হয় না। American Bureau of Justice Statistics- এর তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার ধর্ষণের ঘটনার ১৫% হচ্ছে গণধর্ষণ। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ধর্ষণের ঘটনার ১৬ ভাগ হচ্ছে গণধর্ষণ! গণধর্ষণকারী পুরুষরা সাধারণ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা (বিস্তারিত জানতে দেখুন ক্যাম্পাস রেইপ)। এসব ধর্ষনের মূলে দায়ী করা হয় আলকোহল সেবনকে। American Association of University Women এর সমীক্ষায় দেখা যায়, স্কুলে যারা যৌন নির্যাতনে শিকার হয়েছে তাদের শতকরা ৩৮ ভাগ হয়েছে ক্লাসের শিক্ষকের লালসার বস্তু! অন্যান্য সমীক্ষায় দেখা যায় তাদের শতকরা ১০-১৪ ভাগ ছাত্র (বেশীর ভাগ মেয়ে) স্কুলের শিক্ষকের সাথে যৌন-সংগমে লিপ্ত হয়েছে। ২০০০ সালের স্টাডিতে দেখা যায় প্রায় ৩০০,০০০ (তিন লক্ষ) স্টুডেন্ট স্কুলের শিক্ষক বা কর্মচারীর দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়। ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশনের সমীক্ষা অনুযায়ী আমেরিকার পাবলিক স্কুলে অধ্যয়নরত ছাত্রের ১০% কোন-না-কোন ভাবে স্কুলের টিচারদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন- Sexualharassmenttin Education in US.

প্রগতিশীলতার চারণভূমি বলে খ্যাত ইউরোপের অবস্থাও বেশ শোচনীয়। গার্ডিয়ান পত্রিকায় ইংল্যান্ডের সমাজে গণধর্ষণ নীরব মহামারী নিয়ে প্রতিবেদন করা হয়। ২০০৪ সালে পুলিশ ২০০০ ধর্ষণের কেইস গণধর্ষণ সন্দেহে পুনরায় তদন্ত করে। পাঁচ কিশোর মিলে ১০ বছরের এক বালিকাকে গণধর্ষণ করে। এদের একজন জবান বন্দীতে বলেছে যে গণধর্ষণের আগে ১০ মিনিট পর্ণ ভিডিও দেখে। ইংল্যান্ডের সমাজে গণধর্ষণ একটি স্বাভাবিক ঘটনা। মেয়েরা এ বিষয়ে কথা বলতে চায় না কেননা তারা মনে করে এটি একটি সাধারণ ব্যাপার! গার্ডিয়ানের ভাষায়- “Gang rape is really common,” says a youth worker in Hackney. “Girls won’t talk about it because they think it’s normal and there’s nothing they can do about it.” Met commander Andy Baker, who used to be in charge of street crime, says, “It’s been going on for years. Before I was a policeman, I’d see boys coming out of a shed and a girl following later. Now, I’d know what that was, and so would you.” উন্নত বিশ্বে তরুণদের মধ্যে ৭৫% বিশ বছর বয়সের আগেই যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। দুজনের সম্মত্তিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে তেমন সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না।  এত উদার মনোভাবের পাশ্চাত্যের সমাজেও ধর্ষণ বা গণধর্ষণের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তার মানে দেখা যাচ্ছে প্রগতিশীলতা, অর্থনৈতিক-সমৃদ্ধি ধর্ষণ প্রবণতাকে রোধ করতে পারছে না, দিন দিন এই ব্যাধি বেড়েই চলছে।

প্রগতিশীলতার ব্যানারে ‘নারী অধিকার’ ধ্বজাধারীদের নারী ব্যবসা:

স্বভাবগতভাবে নারীরা সৌন্দর্য সচেতন, আর পুরুষেরা নারীর এই সৌন্দর্যের প্রতি দুর্বল। এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে উঠেছে পণ্য বাজারজাত করণের পলিসি। এজন্য শুরু হয়েছে নারীদেরকে আরো কত যৌন আবেদনময়ী করা যায় তার বিকৃত ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা। শুরুতে এই মানসিকতাকে ছি ছি করলেও মিডিয়ার মাধ্যমে বোম্বার্ডেড হতে হতে তারা এখন এটিকেই সমাজিক ভ্যালু হিসেবে মেনে নিয়েছে। সেই সাথে সামাজিক যে সমস্ত ভ্যালু মেয়েদের মডেস্টিকে প্রমোট করত সেগুলোকে নারী স্বাধীনতার প্রতিবন্ধকরূপে মিডিয়াতে এমনভাবে সুকৌশলে উপস্থাপন করা হলো যে নারীরা নিজে থেকেই লোলুপ পুরুষদের সংজ্ঞায়িত ‘মুক্তি’র স্বাদ পেতে ও প্রগতিশীল হতে গিয়ে সেসব ভ্যালুগুলোকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। যার ফলে নারীরা নিজেদেরকে আরো কত যৌনাবেদনময়ীরূপে উপস্থাপন করা যায়, চেতন বা অবচেতনভাবে সে প্রচেষ্টায় বিভোর থাকে। চেয়ার-টেবিল, ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে এমনকি কল মেরামত করার বিজ্ঞাপনেও যোগসূত্রহীনভাবে নারীদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে নারীর দেহকে প্রদর্শন করে প্রডাক্টটি অন্তরে গেঁথে দেয়া। এভাবে নারীকে বস্তু বা পণ্যের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে ইন্ডিয়ান ফিল্ম যত না কাহিনী-নির্ভর তার চেয়ে বেশী বরং যৌনাবেদনকে ফোকাস করা হয়। এতে তরুণরা সেক্সুয়ালি এক্টিভ বা চার্জড হয়ে থাকে। অন্যদিকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় মূল্যবোধকে মিডিয়াতে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা সেকেলে বা গোঁড়া আখ্যা দিয়ে তরুণ-তরুণীদের মগজ ধোলাই করে বাঁধনহারা মুক্তির স্বাদ নিতে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত দেখা যায় উঠতি বয়সের তরুণরা ইভ টিজিং থেকে শুরু করে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো মানবতা বিরোধী অপরাধে প্ররোচিত হচ্ছে। গত বছর ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের পুলিশের ডিরেক্টের জেনারেল দীনেশ রাডি টিভির লাইভ অনুষ্ঠানে নারীদের অশালীন পোষাক ধর্ষণ প্রবণতাকে প্ররোচিত করতে পারে মন্তব্য করায় তার উপর নারীবাদী ও প্রগতিশীলদের সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

বাস্তবতার নিরিখে ইসলামিক মূল্যবোধ ইভ টিজিংসহ ধর্ষণের মতো সমাজিক ব্যাধির প্রতিরোধে কতটুকু কার্যকরী তা আলোচনার দাবী রাখে। ইসলামিক মূল্যবোধ অনুযায়ী পুরুষ ও নারীকে ভদ্র ও শালীনভাবে পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান ও প্রাত্যহিক জীবন অতিবাহিত করার উপদেশ দেয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়কে বাহ্যিক সৌন্দর্য্যে লালসার দৃষ্টি নিক্ষেপে নিষেধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কুরআনের দুটি আয়াত হচ্ছে:

সুরা নূরে প্রথম নির্দেশনা এসেছে পুরুষদের জন্যে-Tell the believing men to reduce [some] of their vision and guard their private parts. That is purer for them. Indeed, Allah is Acquainted with what they do. (25:30)তারপর এসেছে মেয়েদের জন্যে-And tell the believing women to reduce [some] of their vision and guard their private parts and not expose their adornment except that which [necessarily] appears thereof and to wrap [a portion of] their headcovers over their chests and not expose their adornment except to their husbands, their fathers, their husbands’ fathers, their sons, their husbands’ sons, their brothers, their brothers’ sons, their sisters’ sons, their women, that which their right hands possess, or those male attendants having no physical desire, or children who are not yet aware of the private aspects of women. And let them not stamp their feet to make known what they conceal of their adornment. And turn to Allah in repentance, all of you, O believers, that you might succeed. (25:31)কোরানের প্রতিটি আয়াত এবং শব্দের সাথে সাথে তার ক্রনলজিটাও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে “এবং” দিয়ে আয়াত ৩০-কে ৩১-এর সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং এই বিষয়ে পুরুষদের দায়দায়িত্ব প্রথম এবং পরে নারীদের বিষয়ে দায় অর্পণ করা হয়েছে।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in আলোচনা, ইসলাম ও নারী, ধর্ষন, সংগৃহিত, সমসাময়িক. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s