আমরা কিভাবে ইসলাম মানবো ?


লেখক –  শরীফ আবু হায়াত অপু 

আমরা যারা কোন ফর্ম পূরণের সময় ধর্মের ঘরে “ইসলাম” লিখি তারা স্কুলে পড়াশোনার সময় বিষয় হিসেবে ইসলামিয়াত নামে একটি নির্বিষ বিষয় পড়তাম। নির্বিষতার মাহাত্ম্য – SSC তে এ বিষয়ের মাত্র ১০টা প্রশ্ন পড়েই এ+ বা লেটার পাওয়া যায়, আগের ক্লাসগুলোর কথা আর নাই বা বললাম। আসলে, দুঃখজনক হলেও সত্য  যে আমাদের অনেকেরই বাবা-মা ছোটবেলা থেকে বুঝিয়েছেন যা পড়লে রেজাল্ট ভাল হবে তাই হল কাজের পড়াশোনা আর বাকিটা অকাজের।

১০ পৃষ্ঠা পড়লে যেখানে চলে, কোন পাগল বাকি ৯০ পৃষ্ঠা পড়বে? আর জানার জন্য পড়ার তো প্রশ্নই উঠে না। ফলে ইসলামিয়াতের আবরণ ভেদ করে কখনো আমাদের মনের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রবেশ করতে পারেনি। তো এহেন গুণধরেরা যখন কোন এক মানসিক দুর্বলতার মুহূর্তে বাপদাদার ধর্ম ইসলাম মানার চেষ্টা করে তখন প্রথম বাঁধাটা আসে জানার ক্ষেত্রে। শূণ্য জ্ঞানের পাত্র নিয়ে তখন আমরা বই/ওয়েবসাইট হাতড়াই। এর ফলাফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা হয় তা হল, অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী। কিছু ভাসা ভাসা পড়াশোনা করে আমাদের এই ধারণা জন্মে যায় যে আমরা ইসলাম সম্পর্কে অনেক জানি-বুঝি।

আর আমাদের দেশের ফতোয়া দেয়া কাঠমোল্লা, মিলাদজীবি হুজুর আর মুরিদচোষা পীরদের আধিক্যে আমাদের একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে গিয়েছে – তা হল আমরা পুরো আলিমজাতির উপর একটা বিরূপ ধারণা পোষণ করে চলি। এই জন্য ইসলাম সম্পর্কে জানতে গিয়ে আমরা মনে করি ইসলাম বুঝার জন্য অন্য কারো দরকার নাই, আমরা যা বুঝি তাই চূড়ান্ত।

কিন্তু আসলে কি এভাবে ইসলাম চলে? না। চলে না।

তবে জেনে নেই কিভাবে ইসলাম শিখা এবং মানা উচিত।

ইসলাম শিক্ষাটা একটা সিলসিলার মত ব্যাপার, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা বুঝেছেন, তাঁকে দেখে সাহাবিরা যা বুঝেছেন, তাবেয়িরা যা বুঝেছেন সেটাই কিন্তু ইসলাম। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর ২৩ বছর ধরে কোরআন নাযিল করা হল যাতে তিনি কোরআনের আদেশ নিষেধ নিজের জীবনে প্রতিফলন করে দেখান। আবার তিনি যা বুঝলেন এবং প্রচার করলেন তাই কিন্তু সাহাবিদের জীবনে প্রতিফলিত হল। তাই কোরআন তাফসির এর মূলনীতি বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির তার আল তাফসির আল কোরআন আল আজিম – এর ভূমিকায় লিখলেন :

ক্বুরানের ব্যখ্যা হবে নিম্নোক্ত ধারাবাহিকতায়, একটা না পেলে তবেই এর পরেরটায় যাওয়া যাবে:

১। ক্বুরানের ব্যখ্যা কোরআন দ্বারা। ২। ক্বুরানের ব্যখ্যা রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর বাণী/আদেশ/নিষেধ দ্বারা। ৩। ক্বুরানের ব্যখ্যা রসুলুল্লাহ (সাঃ)এর সাহাবিদের দ্বারা। ৪। ক্বুরানের ব্যখ্যা রসুলুল্লাহ (সাঃ)এর সাহাবিদের তাবেয়িদের দ্বারা। ৫। ক্বুরানের ব্যখ্যা রসুলুল্লাহ (সাঃ)এর তাবেয়িদের তাবেয়িনদের দ্বারা। ৬। ক্বুরানের ব্যখ্যা ক্বুরানের সাতটি ক্বিরাতের দ্বারা। ৭। আরবি ভাষার জ্ঞান দ্বারা।

যিনি শুধু কোরআন পড়লেন (তাও মূল আরবি না, শুধু অনুবাদ) কিন্তু বাকিগুলো সম্পর্কে জ্ঞান রাখলেন না, তিনি যখন কোরআন পড়তে গিয়ে কোন কিছু না বুঝবেন তখন তার সেই “নলেজ গ্যাপ” এর জন্য নিজের মত করে (বেশিভাগ ক্ষেত্রেই শয়তানের মত করে) তার একটা ব্যাখ্যা দাড়া করিয়ে নিবেন। এর উদাহরণ আমাদেরই অনেক ভাই যাদের ধারণা শুধুমাত্র কোরআন মানাটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের বক্তব্য, যেহেতু আল্লাহ কোরআন সংরক্ষণ করবেন বলেছেন সেহেতু কোরআন সংরক্ষিত আছে। যেহেতু হাদিস সরাসরি আল্লাহর বাণী নয় তাই তা বিকৃত হয়ে গেছে এবং এগুলো মানা যাবে না। যদিও বা মানতে হয় তবে চিন্তা ভাবনা করে বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে সেগুলো মানা যেতে পারে। এখানে মূল সমস্যা হল খন্ডিত জ্ঞান। কেউ যদি কোন হাদিসের ভাষ্য বা Text জানেন কিন্তু তার ব্যাখ্যা না জানেন তবে তিনি ব্যাখ্যা না করতে পেরে ধারণা করবেন যেহেতু এটা হাদিস তাই এতে ভুল আছে।

আবার ব্যাপারটি এরকমও হতে পারে যে, কোন একটি বিষয় সম্পর্কে কেউ যদি একটি হাদিস জানেন এবং সেটা থেকে নিজে নিজে কোন সিদ্ধান্তে আসেন তবে সেটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

যেমন অপ্রাপ্তবয়ষ্ক শিশুসন্তানেরা আখিরাতে কি পরিণতি লাভ করবে?

প্রথম হাদিসঃ অপ্রাপ্তবয়ষ্কদের রসুলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিরাজের সময় ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এর সাথে জান্নাতে একটি গাছের কাছে থাকতে দেখেছিলেন।

দ্বিতীয় হাদিসঃ খাদিজা (রাঃ) রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে তাঁর জাহিলিয়াতের সময়কার মৃত সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছিলেন যে তাঁরা জাহান্নামী।

যারা প্রথমটি জানেন তারা অপ্রাপ্তবয়ষ্করা কি পরিণতি লাভ করবে – এর উত্তর দিবেন জান্নাত, যারা দ্বিতীয়টি জানেন তাঁরা বলবেন জাহান্নাম। যিনি প্রথম হাদিসটি জানেন তিনি ইসলামের খন্ডিত জ্ঞানের অধিকারী। যিনি শুধু দ্বিতীয় হাদিসটি পড়লেন তিনি বিবেক দিয়ে বিশ্লেষণ করে বলবেন এটা আবার কেমন বিচার? যে শিশু কোন পাপ করেনি সে কেন আগুনে পুড়বে? যারা দুইটাই জানেন তাদের মনে শয়তান বিভ্রান্তি ঢুকায়ে বলবে দেখেছ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কথা স্ববিরোধী, সুতরাং হাদিস মানার দরকার নাই।

তৃতীয় হাদিসঃ আনাস(রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন কিয়ামাতের দিন অপ্রাপ্তবয়ষ্ক, পাগল এবং যারা দুই নবীর মাঝখানে এসেছে (আহ্লুল ফাতরাহ) তারা পরীক্ষিত হবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন দূত এসে তাদের আল্লাহর নির্দেশে আগুনে ঝাঁপ দিতে বলবেন – যারা এই আদেশ মানবে তাঁরা জান্নাতে যাবে, যারা অগ্রাহ্য করবে তারা জাহান্নামী।

যিনি তৃতীয় হাদিসটিও জানেন তিনি কিন্তু প্রশ্নটির একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। ইসলাম টোটালারিয়ান ভিউ সাপোর্ট করে, ফ্র্যাগমেন্টেড ভিউ না। যেমন একজন মানুষ একটি জানালা দিয়ে একটি রাস্তার কিছু অংশ দেখল যেখানে শুধু কাপড়ের দোকান আছে। এখন সে যদি দাবি করে ঐ রাস্তায় শুধু কাপড়ের দোকান আছে তা ঠিক কিন্তু সম্পুর্ণ ঠিক না। সে যদি ছাদে দাঁড়িয়ে ঐ রাস্তাটি দেখে তবে সে দেখতে পেত কাপড়ের দোকান ছাড়াও আরো অনেক কিছুই ঐ রাস্তায় আছে। জানালার দৃশ্যটি ফ্র্যাগমেন্টেড ভিউ কিন্তু ছাদের দৃশ্য টোটালারিয়ান ভিউ। এমনটি শুধু ইসলাম নয় অনেক অন্য ক্ষেত্রেও একই ভাবে কাজ করে। আমরা জিনোমিক্স নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখেছি আগে যেখানে একটা জিন-এর কাজ নিয়ে গবেষণা হত; এখন হয় পুরো কোষের সব জিন নিয়ে। কারণ ঐ জিনের কাজ পুরো কোষের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায়ই বদলে যায়। ঠিক তেমনি অনেক আয়াত বা হাদিস অন্যান্য সব আয়াত ও হাদিসের সাহায্যে পুরো অর্থ নেয়, একাকি ভিন্ন অর্থ নেয়। পুরো অর্থ মানে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর সাহাবিরা যে অর্থে নিয়েছিলেন এবং জীবনে আমল করেছিলেন সেই অর্থ।

বড় আলিমের সুবিধাটা হল এখানে যে তিনি একটি বিষয় সম্পর্কে সব আয়াত এবং তার সম্পর্কিত হাদিসগুলো জানেন তাই তিনি একটা আয়াত বা একটি বিষয় ব্যাখ্যার সময় আমাদের থেকে ভাল ব্যাখ্যা করতে পারেন। তিনি যদি না জেনেও থাকেন তবে জানার চেষ্টা করে তবেই ব্যাখ্যা করবেন তার আগে করবেন না। আমি যদি সম্পূর্ণ জ্ঞান ছাড়াই আয়াতের অন্তর্নিহিত মানে বুঝতে যাই বা কোন বিষয় ব্যাখ্যা করতে যাই তাহলে সমস্যা হবে। আমার জ্ঞানের অভাবে আমি ভুল ব্যখ্যা করব, কিন্তু শয়তান আমাকে বুঝাবে যে ঐ অশিক্ষিত আলিমের থেকে আমিই ভাল জানি, বুঝি এবং আমার ভুল ব্যাখ্যা নিয়ে আমি তর্ক করব এবং ভুল পথে চলে যাব (নাউযুবিল্লাহ)।

কোন বিষয়ের কোন ব্যাখ্যা বড় কোন আলিম করেছেন, অন্য আলিমরা তাদের এই ব্যাখ্যাকে ঠিক বলেছেন তাদের পরিপূর্ণ জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে, তারপরেই আমাদের উচিত সেটা মেনে নেয়া ও প্রচার করা। যে কেউ ইসলাম নিয়ে সিস্টেমেটিকালি পড়াশোনা করুক, এরপর কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা করুক, সেই ব্যাখ্যা বড় আলিমরা মেনে নিক, আল্লাহর কসম ঐটা মেনে নিতে আমার কোন আপত্তি নাই। কেউ একজন সারাজীবন ফ্লুইড মেকানিক্স পড়ল, পড়াল, রিটায়ার করে যখন দেখল আর কোন কাজ নাই, তখন ইসলামি ফাউন্ডেশন বা আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলির অনুবাদ পড়ে আমাকে বুঝাবে যে হাদিস দরকার নাই, কোরআনেই সব আছে তাহলে আমি এই লোকের ধারেকাছে নাই। ইসলাম পুরাটা না বুঝে খন্ডিত বুঝ নিয়ে অনেক মানুষ নিজে বিভ্রান্ত হয়, অন্যদের বিভ্রান্ত করে ও সমস্ত মুসলিমদের বিপদে ফেলে।

আমরা অন্তত ইসলামের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে অতি গুরুত্ব না দিয়ে বড়মাপের আলিমদের মতামতটা জেনে নিব, তারপরে সেটা নিয়ে কথা বলব। তাদের মধ্যে মতের ভেদাভেদ থাকলে আমরা উভয় মত সম্পর্কে পড়ব, চিন্তা করব তারপর যেটা পছন্দ হবে (জীবনযাত্রার সুবিধার্থে না, ইসলাম মানার ক্ষেত্রে যেটা বেশি তাকওয়াপূর্ণ, ও দলিল নির্ভর) সেটা মেনে নিব। যার মত মেনে নিলাম না তাকে হেয় করব না বরং সম্মান করব। আমরা মনে রাখব আলিমরাই রসুলদের উত্তরাধিকারী। সবচেয়ে ভাল হয় আমরা নিজেরা নিয়মানুযায়ী পড়াশোনা করে আলিম হয়ে যাই। ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি (http://www.islamiconlineuniversity.com) তে অনলাইনে পড়াশোনা করা যায় এমনকি সার্টিফিকেট পর্যন্ত নেয়া যায়। যারা জানার উদ্দেশ্যে জানতে চান তারা আরববিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত আলিম যারা বর্তমানে আমাদের দেশে অবস্থান করছেন তাদের কাছে ফর্মাল ক্লাসের আয়োজন করতে পারেন, এতে নিজের শিক্ষা হল, আরো মানুষ দ্বীন শিখতে পারল।

“ইসলাম একটা সিম্পল, সহজ ধর্ম” – এ কথা বলে যার যা করতে ভাল লাগে সব ইসলামের মধ্যে ঢুকাবে, এটা খুব বড় ধরণের অন্যায়। আমার নিজের কাছে যে ইসলাম মানতে ভাল লাগে তা মানলে আর আল্লাহর ইসলামের দরকার কি ছিল? আমরা ইসলাম মানি আল্লাহকে খুশি করে পুরষ্কার পেতে, তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচতে। এই উদ্দেশ্য সফল করতে আল্লাহ আমাদের জন্য যেই ইসলাম পছন্দ করেছেন ঠিক সেটাই মেনে চলতে হবে।

আল্লাহ আমাদের আপন আত্মার ঔদ্ধত্য থেকে রক্ষা করুন, তাঁর আদেশ ঠিক মত জেনে তা মেনে নেয়ার তৌফিক দিন। আমিন।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in ইসলাম. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s