রাজনৈতিক বিজয়ই কি ইসলামের বিজয়??


সম্প্রতি নির্বাচনে জয়লাভের পর ইসলামী গনতান্ত্রীক পার্টিগুলির ভূমিকা কী ছিল একটু দেখুন-

(১)  আরব বসন্ত শুরু হয় যে তিউনিসিয়ায়, সেখানকার ইসলামী দল আন-নাহযার    চেয়ারম্যান রশীদ ঘানুসী (৭০) দীর্ঘ ২০ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে   স্বদেশে  ফিরে ঘোষণা করেছেন যে, ‘ক্ষমতায় গেলে তার দল শরীয়া আইন বাস্তবায়ন   করবে না’। নাহযাহ  পার্টির এক মুখপাত্র বলেন, তারা তিউনিসিয়াকে   মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উদার  গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করবেন।

সেখানে  মাদক  নিষিদ্ধ করা হবে না বা বিদেশীদেরকে  সী বীচে বিকিনি পরিধান নিষিদ্ধ  করা  হবে না। ইসলামী ব্যাংকিংকে বাধ্যতামূলক করা হবে  না। কেননা তাঁর মতে   তিউনিসিয়া সবার দেশ। রশিদ ঘানুসির ভাষায়- ‘এ দেশে গড,  নবী, নারী, পুরুষ,  ধার্মিক, অধার্মিক নির্বিশেষে সকলের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। কেননা  তিউনিসিয়া সকলের’ (বিবিসি নিউজ, ২৭  অক্টোবর’১১)

পাঠক  খেয়াল করুন, এত বড় একজন ইসলামী নেতা ‘আল্লাহ’ না বলে ‘গড’ বলছেন। ২০   বছর  লন্ডনে থেকে ব্রেন ওয়াশ হয়ে গেছে বলেই তো মনে হয়। জানা আবশ্যক যে,   ‘আল্লাহ’  নামের কোন প্রতিশব্দ নেই। এর পরিবর্তে গড, ঈশ্বর, ভগবান,   সৃষ্টিকর্তা, উপরওয়ালা  ইত্যাদি বলা নিষিদ্ধ।

(২) মরক্কোর  বিজয়ী ইসলামী দল পিজেডি ঘোষণা করেছে, তারা জনগণের উপর ইসলামের   কোনো  বিধান চাপিয়ে দেবে না। বরং তারা ইসলামী অর্থনীতি অনুসরণ করে দেশকে  উন্নয়ন,   অধিকতর সমবণ্টন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টা করবে। তবে মাদক এবং   মহিলাদের পর্দার  মত বিষয়গুলোতে তারা কোন মতামত দেবে না। কেননা মরক্কো   পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয়  স্থান (বিবিসি নিউজ, ২৭  নভেম্বর’১১)

(৩)  বহুল প্রসিদ্ধ ইখওয়ানুল মুসলেমীনের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম এন্ড  জাস্টিস   পার্টি ঘোষণা করেছিল যে, একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকেও মিসরের  রাষ্ট্রপ্রধান  হিসাবে  মেনে নিতে তাদের কোন আপত্তি থাকবে না। যার  ধারাবাহিকতায় বর্তমান  প্রেসিডেন্ট মুরসী  তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে  গ্রহণ করেছেন একজন কপটিক  খ্রিষ্টানকে এবং একজন  নারীকে। তারা তাদের ইসলামী শ্লোগান বাদ দিয়ে এখন করেছে কেবল ‘ন্যায় বিচার,  স্বাধীনতা ও সমতা’।

আফসোস!  এই তথাকথিত বিজয় যে কত  ভঙ্গুর তার নিদর্শন বারবার প্রকাশিত হওয়ার  পরেও  এসব ইসলামী রাজনীতিকদের হুঁশ ফেরে  না। যেমন অনেক টালবাহানার পর গত  ২৪শে  জুন’১২ ঘোষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলে  দেখা গেল যে, ১ কোটি ৩২  লাখ  ভোট পেয়ে ইখওয়ানের প্রার্থী মুহাম্মাদ মুরসী মিসরের  প্রেসিডেন্ট  হয়েছেন।  মোবারকপন্থী প্রার্থী আহমাদ শফিক তাঁর চেয়ে মাত্র ৯ লাখ ভোট  কম  পেয়েছেন।  অথচ তার আদৌ ভোট পাওয়ার কথা নয়।

তাই আগামী নির্বাচনে  এটুকু উৎরে  যেতে  সেক্যুলারদের কোন সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। পত্রিকায়  এসেছে যে,  পাশ্চাত্যের সাথে  সমঝোতার মাধ্যমেই মুরসীকে নির্বাচিত ঘোষণা  করা হয়েছে।  অর্থাৎ সেক্যুলারদের চাইতে  তিনি হবেন আরও এক কদম বাড়া। যেমন  তুরস্কের  অবস্থা হয়েছে। আর সেকারণেই পশ্চিমা বিশ্ব খুশী হয়ে এই বিপ্লবকে  ‘আরব বসন্ত’ (Arab Spring) বলে  অভিনন্দিত করেছে। কারণ এটি তাদের কাছে একটি  বড় সুসংবাদ। সম্প্রতি  সিরিয়ার  বিদ্রোহীদের প্রতি ইসরাঈলের প্রকাশ্যে  সমর্থন ঘোষণায় বিদ্রোহীদের   হাস্যোজ্জ্বল মিছিলের চেহারা পত্রিকায় এসেছে।  হায়রে মুসলমান! নিজেদের ধ্বংস  কামনায়  তোমরা কতই না দুঃসাহসী!!

ইহুদী-নাছারা  ও সেক্যুলারদের পাতানো দলতন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে কথিত ইসলামী    দলগুলি  নতুন হিসাবে প্রথমবারে কিছু বেশী ভোট পাওয়ায় উনারা খুশীতে হুঁশ   হারিয়ে   ফেলেছেন। তারা কি ভুলে গেছেন যে, শতকরা ১০০ ভাগ ভোট পেয়েও শেখ   মুজিব বা  সাদ্দাম  হোসেন টিকতে পারেননি? অতএব ভোট পাওয়া না পাওয়ার সাথে    সত্য-মিথ্যার কোন সম্পর্ক  নেই। মূল বিষয়টি হ’ল ইসলামী দলগুলি জনগণকে    ইসলামের পথে পরিচালিত করতে চায়, না কি  শয়তানী পথে পরিচালিত করতে চায়-সে    ব্যাপারে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইসলামের  রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক    কল্যাণকারিতা তারা কতটুকু জনগণকে বুঝাতে পেরেছেন? কিংবা তারা  নিজেরা বা    তাদের কর্মীরা কতটুকু বুঝেন ও আমল করেন?

বিগত শতাব্দীর  শুরুতে আরব জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সুঁড়সুড়ি দিয়ে   কামাল পাশা ও  তার সাথীদের মাধ্যমে ওছমানীয় খেলাফত ধ্বংস করে বিশ্বশক্তি  তুরষ্ককে  যারা  ‘ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি’ বানিয়েছিল এবং ঐক্যবদ্ধ ইসলামী  খেলাফতকে ভেঙ্গে   টুকরা টুকরা করে যারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল।  যদিও বাহ্যিক ভাবে  এগুলি  স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল এবং আছে। তারাই এখন পুনরায়  গণতন্ত্রের ও  ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের  সুঁড়সুড়ি দিয়ে বাকী মুসলিম বিশ্বকে  গ্রাস করার জন্য  ধাপে ধাপে এগিয়ে আসছে।

ইতিমধ্যেই তারা ইন্দোনেশিয়া ও   সূদানকে বিভক্ত করেছে। অতঃপর লিবিয়াকে কুক্ষিগত  করেছে ও সেখান থেকে তৈল   লুট করছে। এখন বাকীগুলিকে একে একে গ্রাস করতে চলেছে।  হাতিয়ার হ’ল কথিত   গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদ। তাদের চালান করা এইসব  শয়তানী   মতবাদের অস্ত্র প্রয়োগ করে তারা নামধারী মুসলিম নেতাদের দিয়েই বিশ্বব্যাপী    মুসলিম নিধনে মেতে উঠেছে ও একে একে মুসলিম দেশগুলিতে আগ্রাসন চালাচ্ছে।   সেক্যুলার  নেতারা তো তাদের দাবার ঘুঁটি আছেনই। বাকী ইসলামী নেতাদেরকে যদি   আদর্শচ্যুত করা  যায়, তাহ’লে তাদের সামনে আর কোন বাধা থাকে না।

বস্ত্ততঃ  ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মাধ্যমে তারা প্রথমে মুসলমানকে  ধর্মের  গন্ডীমুক্ত  করে। অতঃপর জাতীয়তাবাদের বিষ ছড়িয়ে তাদের ঐক্য  ছিন্নভিন্ন করে। অতঃপর   গণতন্ত্রের মাধ্যমে তাদেরকে মানুষের গোলাম বানায়।  ফলে মানুষ এখন মানুষের  দাসত্বের  অধীনে চরমভাবে পিষ্ট হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী  চলছে এই শয়তানী  হানাহানির বহ্ন্যুৎসব।  ইসলামী নেতাদের উচিত ছিল সর্বাগ্রে  মানুষকে  তাওহীদের শিক্ষা দানের মাধ্যমে  আল্লাহর দাসত্বে ফিরিয়ে আনা। তার  পরেই  মানুষ সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার স্বাদ  পেত। মানবতা মুক্তি পেত।

মনে  রাখা উচিত যে, এ দুনিয়ার কেউ চিরকাল বেঁচে থাকবে না। অতএব ইসলামী   নেতারা  যদি দুনিয়াবী বিপদের ভয়ে পথভ্রষ্ট হন এবং নিজেদের জান বাঁচানোর জন্য    হিকমতের নামে বা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বাতিলের সঙ্গে আপোষ করেন, তবে   তাদের জন্যেও  জাহান্নাম অবধারিত।

ইসলামী গনতন্ত্রকামীরা  তুরষ্ক, তিউনিসিয়া, মালয়েশিয়া, মিসর  ও ভারতে ইসলামী  আন্দোলনের কৌশলগত  অবস্থান পরিবর্তনের প্রশংসা করে বলেন, এর  আসল  লক্ষ্য হ’ল ‘দ্বীনের  বাস্তবায়ন’! এখানে তারা সূরা ছফ ৯ আয়াতটির অপব্যাখ্যা   করেন।

পূর্ণ  আয়াতটি হ’ল,هُوَ الَّذِيْ  أَرْسَلَ  رَسُوْلَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ  الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّيْنِ   كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ  الْمُشْرِكُوْنَ    ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি স্বীয় রাসূলকে হেদায়াত ও   সত্যদ্বীন সহ প্রেরণ  করেছেন সকল দ্বীনের উপর তাকে বিজয়ী করার জন্য। যদিও  মুশরিকরা  তা অপসন্দ  করে’ (ছফ  ৬২/৯)। অর্থাৎ তাদের মতে ঐসব দেশে  দ্বীনের বিজয় হয়েছে  ইসলামকে  বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে আপোষ  করার কারণে। অতএব আমাদেরও  সেটা করা উচিৎ।

প্রশ্ন হ’ল,  উক্ত আয়াতে দ্বীনকে বিজয়ী করার অর্থ কি রাজনৈতিক বিজয়? সকল  দ্বীনের উপর  বিজয় অর্থ কি সকল রাষ্ট্রের উপর বিজয়? আমাদের নবী (ছাঃ) মৃত্যুর তিন বছর  পূর্বে মক্কা জয় করেন। তার  অর্থ তৎকালীন  বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের উপর বিজয়  নয়। তিনি তো সে সময়ের পরাশক্তি রোম ও   পারস্য জয় করেননি। জয় করেননি  ভারত-বাংলাদেশ কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা। তার অর্থ  কি তিনি  সকল দ্বীনের উপর  বিজয় লাভ করেননি? অবশ্যই করেছেন। তবে সেটা  আদর্শিক বিজয়। কথিত  রাজনৈতিক  বিজয় নয়।

তাদের মত রাজনৈতিক মুফাসসিরদের মাথায় কেবলই  রাজনৈতিক  ক্ষমতার চিন্তা ঘুরপাক  খায়। তাই রাজনৈতিক বিজয়কেই তারা আসল বিজয়  মনে করেন। অথচ  আল্লাহ এখানে  বলেছেন لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّيْنِ   كُلِّهِ   ‘সকল দ্বীনের উপর বিজয়’। সকল  রাষ্ট্রের উপর বিজয় নয়। কুফরী  মতবাদের কাছে সিজদা করে দু’চারটে এম.পি/মন্ত্রী পদ দখল করার নাম  ইসলামের   বিজয় নয়। ইসলাম নিঃসন্দেহে বিশ্ববিজয়ী আদর্শ। নেতাদের কর্তব্য হ’ল ইসলামের    বিজয়ী আদর্শ সেক্যুলার নেতাদের কাছে তুলে ধরা এবং এর কল্যাণকারিতার প্রতি   বিশ্বকে  আকৃষ্ট করা। যে দেশের জনগণ যত দ্রুত এটা বুঝতে পারবে, সেদেশে তত   দ্রুত ইসলাম তার  আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিজয় লাভ করবে।

জানা  আবশ্যক যে, ইসলামী খেলাফত ইসলামী তরীকায় প্রতিষ্ঠিত হবে। কুফরী তরীকায়    নয়। তাই সবকিছুর পূর্বে ইসলামের পক্ষে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা আবশ্যক।  অতঃপর  জনগণ ইসলামী  খেলাফত চায় না মানুষের মনগড়া বিধান চায়, তার উপর জনমত  যাচাই  হবে। এরপর কে খলীফা  হবেন, দল ও প্রার্থীবিহীনভাবে সে নির্বাচন হবে।  সেই  নির্বাচনের পথ ও পদ্ধতি ইসলামী  নীতিমালার আলোকে নির্বাচন কমিশন  নির্ধারণ  করবে। গণতন্ত্রের নামে প্রচলিত দলতন্ত্র  ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসন  স্রেফ একটা  কুফরী ও জংলী শাসন ছাড়া কিছুই নয়। শান্তিপ্রিয়  স্বাধীন মানুষ  কখনোই এই  প্রতারণাপূর্ণ নিষ্ঠুর ও নির্যাতনকারী শাসন চায় না। বিকল্প  কিছু  সামনে না  থাকাতেই মানুষ এই নির্বাচনী যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট হচ্ছে।

অতএব  সকল ইসলামী দলের নেতাদের বলব, আল্লাহকে ভয় করুন। ইসলামকে ছেড়ে  বাতিলের   মধ্যে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবেন না। কুফরের সাথে আপোষকামী পথ  ছেড়ে  তাওহীদের  জান্নাতী পথে ফিরে আসুন। দেশে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার একক  লক্ষ্যে  সকল দল ঐক্যবদ্ধ হৌন।  এতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে। আর  প্রকৃত  মুমিনের জন্য আল্লাহর সন্তষ্টি  ভিন্ন আর কোন কিছুই লক্ষ্য থাকতে  পারে না।  আল্লাহ আমাদেরকে হক-এর উপর দৃঢ় থাকার  তাওফীক দান করুন- আমীন! (সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত http://at-tahreek.com/august2012/2-8.html)

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in ইসলাম. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s