রাসুল (সঃ) কে অবমাননা করে মতলবি সিনেমা এবং প্রতিবাদের ভুল পথ


লেখক – মিলা

মুল লেখা এখানে

মধ্যপ্রাচ্য আবার খবরের শিরোনামে।

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি অবমাননাকর সিনেমা তৈরীর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা লিবিয়ার মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রদূতসহ চারজনকে হত্যা করেছে।

বিক্ষোভ চলছে মিসরে, সুদানে, ইয়েমেনে …

আমেরিকা লিবিয়ার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছে।

আমি মইনকে ফোন করলাম।

সে আমাকেই প্রশ্ন করলো, ‘বলো তো এই সিনেমা বানানো হয়েছে কেন?’

আমি বললাম, ‘সবাই তো বলছে, মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার জন্য।’

মইন বললো, ‘কিন্তু, মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার পিছনের উদ্দেশ্য কি?’

আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘কি?’

সে বললো, ‘এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে গেলে তোমাকে জানতে হবে আমেরিকায় এখন কি ঘটছে বা সামনে কি ঘটতে যাচ্ছে।’

আমি বললাম, ‘সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছাড়া আমেরিকায় তেমন কিছু ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে বলে তো মনে পড়ছে না।’

মইন বললো, ‘আমেরিকানরা আমাদের মত ক্ষনিক-সৃত্মির হুজুগে জাতি। এ কারণে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে সেখানে নানা ধরণের হুজুগ তৈরী করা হয়। কখনো প্রেসিডেন্টের কোন কেলেংকারীর তথ্য ফাঁস হয়, কখনো লাদেনের ভিডিও ছাড়া হয়, কখনো বা অন্য দেশে যুদ্ধ বাধানো হয়। এ নিয়ে হলিউডে কিছু মুভিও তৈরী হয়েছে।’

আমি বললাম, ‘হ্যা, এই জাতীয় একটা মুভি দেখেছিলাম মনে হচ্ছে। নামটা মনে করতে পারছি না।’

মইন বললো, ‘তুমি হয়তো ওয়াগ দ্যা ডগ – নামের মুভিটার কথা বলছো। এই মুভিটির বিষয়ে একজন ব্লগার লিখেছিলেন:’

এইচ বি ও তে ওয়াগ দ্যা ডগ নামে একটি মুভি দেখেছিলাম দুই হাজার সালের দিকে। কাহিনী ছিল এরকম – আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র দুঞ্চ সপ্তাহ আগে প্রেসিডেন্টের একটা মারাত্মক কেলেংকারী ফাঁস হয়ে যায়। প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হবার স্বপ্ন যখন ধূলিস্যাত হবার উপক্রম, তখন তাঁকে বাঁচাবার জন্য তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ সহকারী ডেকে আনলেন হলিউডের প্রথিতযশা প্রযোজক স্ট্যানলি মসকে। মসের বিশাল বাড়িটিই একটি শুটিং স্পট। সেখানে তিনি কাজ শুরু করে দিলেন। এক আলবেনীয় চেহারার তরুনীকে ওয়াশিংটনের রাস্তা থেকে নিয়ে আসা হল। তাকে বাড়ির সবুজ লনে নিয়ে গিয়ে তার হাতে একটি বড় প্যাকেট দিয়ে বলা হলো প্যাকেটটি বুকে আঁকড়ে ধরে দৌড়ে যেতে। দেখা গেল সেই ভিডিও চিত্রটি কম্পিউটারে নিয়ে মসের টিম কাজ করছে।

পরের দৃশ্যে দেখা গেল আমেরিকার সবগুলো টিভি চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ হিসাবে এসেছে আলবেনিয়ায় যুদ্ধের খবর। খবরে দেখা গেল নিরীহ গ্রামবাসীর উপর বৃষ্টির মত বোমা পড়ছে। তার মধ্যে প্রিয় বিড়ালছানাটি বুকে জড়িয়ে ধরে একটি তরুনী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যাচ্ছে। তরুনীটি আর কেউ নয়, আগের দৃশ্যে যার ভিডিও চিত্র নেয়া হয়েছিল সেই। মুভি এডিটর মেয়েটির ছবি রেখে তার চারপাশের সবকিছু পাল্টে দিয়ে একটা যুদ্ধের ছবি বানিয়ে দিয়েছে এবং আমেরিকান মিডিয়া তাকেই খবর হিসাবে সারাবিশ্বে প্রচার করছে। অন্যান্য দেশের টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকাও জুড়ে থাকলো একই ছবি, একই খবর। এখানেই শেষ নয়। খবরে বলা হল স্যাটেলাইটে পাওয়া তথ্যেও যুদ্ধের সত্যতার প্রমান পাওয়া গেছে। মুহুর্তের মধ্যে সারা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকানদের দৃষ্টি প্রেসিডেন্টের কেলেংকারী থেকে ঘুরে কথিত যুদ্ধের দিকে চলে গেল। বিভিন্ন মহল থেকে উক্ত দেশে সৈন্য পাঠাবার দাবী উঠতে থাকলো। উক্ত দেশের প্রবাসীরা মিছিল করে, সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের কাছে গিয়ে তাদের দেশের সাধারন মানুষদেরকে ডিক্টেটরের হাত থেকে বাঁচানোর আবেদন করতে থাকলো। মানবতাবাদী আমেরিকা নির্যাতিত মানুষের দুঃখে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠতে লাগলো। অবশেষে প্রেসিডেন্ট বাধ্য হলেন উক্ত দেশটিতে সেনা পাঠিয়ে বিশ্ব মানবতাকে রক্ষা করতে।

অসম্ভব নিপুনতার সাথে ছবিটিতে দেখানো হয় কিভাবে মিডিয়াকে ব্যবহার করে আমেরিকার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, আমেরিকান জনগনকে বোকা বানানো হয় এবং কিভাবে বিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষ, যাদের সাথে আমেরিকার কোন বিরোধ কিংবা বিশেষ বন্ধুত্ব কিছুই নেই, তারা কিভাবে এই খেলার নির্মম শিকারে পরিনত হয়ে যায়। মুভিটি নির্মিত হয়েছিল টুইন টাওয়ার ধ্বংসের কয়েক বছর আগে ১৯৯৭ সালে এবং মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৮ সালেন জানুয়ারীতে। এই জাতীয় ঘটনা আমেরিকার রাজনীতিতে এতো বেশী ঘটে থাকে যে, মুভির কাহিনীকে বাস্তবতারই প্রতিরূপ হিসাবে সবাই দেখেছেন এবং সেসময় কেউই একে অবাস্তব কিংবা অতিরঞ্জিত মনে করেননি।

http://www.sonarbangladesh.com/blog/dalia_satter/38943

আমি বললাম, ‘তুমি কি বলতে চাইছো যে, বারাক ওবামার আগামী নির্বাচনে পরাজয়ের পথ তৈরী করার জন্যই এই মুভি?’

মইন বললো, ‘এক্সাক্টলি। বুশের বিদায়ের পর বারাক ওবামা মুসলিম বিশ্বের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে এসেছিলেন। তার আমলে তিনি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে নতুন কোন যুদ্ধ শুরু করেননি। মধ্যপ্রাচ্যে যে বিপ্লব হয়েছে, তাকে তিনি শক্তি দিয়ে বন্ধ করতে চাননি। বুশ থাকলে নিশ্চয়ই ইসলামী দলগুলো তিউনিসিয়া এবং মিসরে ক্ষমতায় আসতে পারতো না।’

আমি বললাম, ‘কিন্তু এই মুভি কিভাবে তাকে নির্বাচনে হারাবে?’

মইন বললো, ‘মুভিটি তৈরীর ফলে ওবামা উভয় সংকটে পড়েছেন। তার সংকট ততো তীব্র হবে এর প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যতবেশী আমেরিকা বিরোধী সহিংসতা ঘটবে। যেমন লিবিয়াতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হত্যার ঘটনা তার বিপক্ষে যাবে। তিনি সেখানে সৈন্য পাঠালেও সমস্যা না পাঠালেও সমস্যা। আবার ছবিটি নিষিদ্ধ করা আমেরিকার আইনে হয়তো সম্ভব হবে না। নিষিদ্ধ করলে তাকে মুসলমানদের চাপের কাছে নতি স্বীকারকারী হিসাবে দেখানো হবে। এমনিতেই তার মুসলিম পিতার বিষয়টি নিয়ে তিনি চাপের মধ্যে থাকেন।’

আমি বললাম, ‘ইউটিউবে ছবিটির যতটুকু দেখেছি, তাতে যে কোন মুসলমানের মাথা গরম হয়ে যাবে। এর প্রতিবাদও কি করা যাবে না?’

মইন বললো, ‘অবশ্যই প্রতিবাদ করা যাবে, প্রতিবাদ হতে হবে। তবে প্রতিবাদের ধরণটি কেমন হবে তার উপর নির্ভর করছে মুসলমানেরা কতুটুকু ফাঁদে পা দিবে।’

আমি বললাম, ‘তুমি কি বলতে চাইছো?’

মইন বললো, ‘দ্যাখো, সিনেমার প্রতিবাদ সিনেমা দিয়ে করতে হয়, কবিতার প্রতিবাদ কবিতা দিয়ে করতে হয়। হত্যা করে, আগুন লাগিয়ে এগুলোর প্রতিবাদ করা হলে তারা এগুলোকে ফাঁদ হিসাবে ব্যবহার করার সুযোগ পায়। মুসলমানদের তো টাকার অভাব নেই। তারা ইসলাম ধর্ম নিয়ে কয়েকশ ভালো সিনেমা বানাক। তারা আমেরিকার অত্যাচার নিয়ে কয়েক ডজন বিশ্ব মানের সিনেমা তৈরী করুক। তুমি আমেরিকান এ্যকশন মুভিগুলোতে দেখবে, সব সময় দেশটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভিলেন হিসাবে দেখানো হয়। এক সময় দেখানো হতো রাশিয়ান এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর জনগণকে। এখন দেখানো হয় কোরিয়ান ও আরবদেরকে। এরা পৃথিবী ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করে। তখন আমেরিকান হিরো এসে পৃথিবী রক্ষা করে।’

আমি বললাম, ‘তোমার কথা সত্য। এখনকার অনেক এ্যকশন মুভিতে আরবরা থাকে ভিলেইন।’

মইন বললো, ‘আমেরিকা যেভাবে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, অন্য দেশ দখল করে, অত্যাচার করে সেগুলো নিয়ে মুভি তৈরী করে ছাড়া হলে আমেরিকানরা বুঝবে অনুভূতিতে আঘাত করলে কেমন লাগ। তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার আসল রূপ তখন বেরিয়ে যাবে। পরবর্তীতে মতলবি লোকেরাও এ ধরণের সিনেমা বানাতে গেলে অনেকবার চিন্তা করবে।’

আমি বললাম, ‘তার মানে কি ততোদিন পর্যন্ত সকলে চুপ থাকবে?’

মইন বললো, ‘যে কোন অন্যায়ের, উগ্রতার, বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, সেই প্রতিবাদ হতে হবে কড়াকড়ি রকমের শান্তিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে প্রতিবাদ পাঠাতে হবে। ইউটিউবে মন্তব্য করা যায়। এই ভিডিওতে যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য করতে হবে। আমেরিকার প্রত্রিকাগুলোতে ই-মেইলে প্রতিবাদ করতে হবে। যে সব আন্তর্জাতিক পত্রিকায় পাঠকের মন্তব্য প্রকাশের ব্যবস্থা আছে, সে গুলোতে মন্তব্য করতে হবে। আল জাজিরাসহ অনেক চ্যানেলে ভয়েস পোস্ট পাঠানো যায়। ভয়েস পোস্ট হচ্ছে নিজের কথা রেকর্ড করে পাঠানো। এর প্রতিবাদ করে ভয়েস পোস্ট পাঠাতে হবে।’

আমি বললাম, ‘একটা ব্যাপার বলো তো, আমরা প্রতিবাদের সময় উগ্র ও সহিংস হয়ে পড়ি কেন?’

মইন বললো, ‘তুমি লক্ষ্য করলে দেখবে, যাদের কথার সমস্যা তারা খুব রাগী হয়ে থাকে। কেননা, তাদের নিজেদের মনের ভাব পুরোপুরি প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকে না। শিল্প-সাহিত্য-সিনেমা ইত্যাদিতে পিছিয়ে থাকার কারণে আমরা নিজেদের ক্ষোভকে ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারি না। ফলে উস্কানীর মুখে আমরা উগ্র ভাষা ব্যবহার করি, উগ্র আচরণ করি, কখনো বা সহিংস হয়ে পড়ি। একটা উদাহরণ দিই। বায়তুল মোকাররমের খতিব মওলানা ওবায়দুল হক ছিলেন সকলের সম্মানের পাত্র। তাঁর দৃঢ়চেতা স্বভাব তাকে অন্য রকম একটি স্থান দিয়েছিল। আমেরিকা যখন ইরাক দখল করে তখন তিনি ঈদের জামাতে বলেছিলেন, সারা পৃথিবীর সব মুসলমান যদি আমেরিকার উদ্দেশ্যে থুথুও ফেলে, তাহলেও দেশটি ভেসে যাবে। আমেরিকার প্রতি তার ক্ষোভ ছিল যুক্তিযুক্ত, কিন্তু ভাষাটি ছিল আপত্তিকর। এ জন্য তিনি নিন্দিত হয়েছিলেন।’

আমি বললাম, ‘কিন্তু মুসলিম দেশগুলোর এতো টাকা থাকতেও তারা কেন শিল্প-সাহিত্য-সিনেমা ইত্যাদিতে পিছিয়ে আছে?’

মইন বললো, ‘এ তো বিশাল গবেষণার বিষয়। আরবদের কথা বাদ দাও, বাংলাদেশের কথাই ধরো না। এদেশের ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভিতর থেকে কতজন ভালোমানের কবি, সাহিত্যিক, লেখক, নাট্যকার তৈরী হয়েছে?’

আমি বললাম, ‘কিন্তু কেন?’

মইন বললো, ‘সোজা উত্তর হচ্ছে, সৃষ্টিশীল মানুষকে তারা পৃষ্ঠপোষকতা করে না।’

আমি পাল্টা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলাম। তখন ডোরবেল বাজলো। ফোন রেখে দিলাম।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in মুসলিম জাহান. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s