ওয়াগ দ্যা ডগ এবং লাদেন কাহিনী


লেখক- ডালিয়া সাত্তার

মুল লেখা এখানে

এইচ বি ও তে ওয়াগ দ্যা ডগ নামে একটি মুভি দেখেছিলাম দুই হাজার সালের দিকে।  কাহিনী ছিল এরকম – আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র দুঞ্চ সপ্তাহ আগে প্রেসিডেন্টের একটা মারাত্মক কেলেংকারী ফাঁস হয়ে যায়।  প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হবার স্বপ্ন যখন ধূলিস্যাত হবার উপক্রম, তখন তাঁকে বাঁচাবার জন্য তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ সহকারী ডেকে আনলেন হলিউডের প্রথিতযশা প্রযোজক স্ট্যানলি মসকে।  মসের বিশাল বাড়িটিই একটি শুটিং স্পট।  সেখানে তিনি কাজ শুরু করে দিলেন।  এক আলবেনীয় চেহারার তরুনীকে ওয়াশিংটনের রাস্তা থেকে নিয়ে আসা হল।  তাকে বাড়ির সবুজ লনে নিয়ে গিয়ে তার হাতে একটি বড় প্যাকেট দিয়ে বলা হলো প্যাকেটটি বুকে আঁকড়ে ধরে দৌড়ে যেতে।  দেখা গেল সেই ভিডিও চিত্রটি কম্পিউটারে নিয়ে মসের টিম কাজ করছে।

পরের দৃশ্যে দেখা গেল আমেরিকার সবগুলো টিভি চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ হিসাবে এসেছে আলবেনিয়ায় যুদ্ধের খবর।  খবরে দেখা গেল নিরীহ গ্রামবাসীর উপর বৃষ্টির মত বোমা পড়ছে।  তার মধ্যে প্রিয় বিড়ালছানাটি বুকে জড়িয়ে ধরে একটি তরুনী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যাচ্ছে।  তরুনীটি আর কেউ নয়, আগের দৃশ্যে যার ভিডিও চিত্র নেয়া হয়েছিল সেই।  মুভি এডিটর মেয়েটির ছবি রেখে তার চারপাশের সবকিছু পাল্টে দিয়ে একটা যুদ্ধের ছবি বানিয়ে দিয়েছে এবং আমেরিকান মিডিয়া তাকেই খবর হিসাবে সারাবিশ্বে প্রচার করছে।  অন্যান্য দেশের টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকাও জুড়ে থাকলো একই ছবি, একই খবর।  এখানেই শেষ নয়।  খবরে বলা হল স্যাটেলাইটে পাওয়া তথ্যেও যুদ্ধের সত্যতার প্রমান পাওয়া গেছে।  মুহুর্তের মধ্যে সারা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকানদের দৃষ্টি প্রেসিডেন্টের কেলেংকারী থেকে ঘুরে কথিত যুদ্ধের দিকে চলে গেল।  বিভিন্ন মহল থেকে উক্ত দেশে সৈন্য পাঠাবার দাবী উঠতে থাকলো।  উক্ত দেশের প্রবাসীরা মিছিল করে, সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের কাছে গিয়ে তাদের দেশের সাধারন মানুষদেরকে ডিক্টেটরের হাত থেকে বাঁচানোর আবেদন করতে থাকলো।  মানবতাবাদী আমেরিকা নির্যাতিত মানুষের দুঃখে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠতে লাগলো।  অবশেষে প্রেসিডেন্ট বাধ্য হলেন উক্ত দেশটিতে সেনা পাঠিয়ে বিশ্ব মানবতাকে রক্ষা করতে।

অসম্ভব নিপুনতার সাথে ছবিটিতে দেখানো হয় কিভাবে মিডিয়াকে ব্যবহার করে আমেরিকার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, আমেরিকান জনগনকে বোকা বানানো হয় এবং কিভাবে বিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষ, যাদের সাথে আমেরিকার কোন বিরোধ কিংবা বিশেষ বন্ধুত্ব কিছুই নেই, তারা কিভাবে এই খেলার নির্মম শিকারে পরিনত হয়ে যায়।  মুভিটি নির্মিত হয়েছিল টুইন টাওয়ার ধ্বংসের কয়েক বছর আগে ১৯৯৭ সালে এবং মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৮ সালেন জানুয়ারীতে।  এই জাতীয় ঘটনা আমেরিকার রাজনীতিতে এতো বেশী ঘটে থাকে যে, মুভির কাহিনীকে বাস্তবতারই প্রতিরূপ হিসাবে সবাই দেখেছেন এবং সেসময় কেউই একে অবাস্তব কিংবা অতিরঞ্জিত মনে করেননি।

এগারোই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে হামলা, তার পর পরই বিন লাদেন কতৃক হামলাকে সমর্থন করার খবর, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল, ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে আমেরিকা ও বৃটিশ গোয়েন্দাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ইরাকে আগ্রাসন ইত্যাদি ঘটনা এবং সেগুলি ঘটার আগে লাদেনের অডিও ও ভিডিও টেপ, ইন্টারনেটে আল কায়েদার বিবৃতি ইত্যাদির সাথে ওয়াগ দ্যা ডগের কাহিনীর কোথায় যেন মিল রয়েছে।  মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তি যে পর্যায়ে এসেছে, তাতে কারো আগের ভিডিও ছবি ব্যবহার করে তাকে দিয়ে কিছু বলানো, অডিও টেপে কারো গলার নকল করে অস্পষ্ট কিছু কথা তৈরী করার জন্য হলিউডের স্টুডিও লাগে না।  ওয়েবসাইট প্রকাশ করা তো এখন ছেলের হাতের মোয়া।  অথচ দেখা যায় যে, আন্তর্জাতিক মিডিয়া এসকল সূত্রগুলোকে ভিত্তি করে গুরুত্ব দিয়ে খবর প্রচার করছে।  তাকে ভিত্তি করে শক্তিশালী দেশগুলো বিভিন্ন দেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে, পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারন করছে ও বিভিন্ন ধরনের তালিকা প্রকাশ করছে।

এধরনের সন্দেহ হবার আরেকটি কারন হচ্ছে যে, এ ধরনের অধিকাংশ হামলা বা বিবৃতির কিছুদিনের মধ্যেই কোন না কোন ধরনের আগ্রাসনের ঘটনা ঘটছে।  যেমন টুইন টাওয়ারে হামলা ও লাদেন কর্তৃক তাকে সমর্থনের পর আফগানিস্তান দখল হল।  ইরাক দখলের আগে বিবিসির মত সংবাদ মাধ্যম প্রচার করলো যে, ইরাকের হাতে যে রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে তা দিয়ে খোদ আমেরিকাতেও হামলা চালানো যাবে এবং তার জন্য লাগবে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট।  ইরাক দখলের বিরুদ্ধে যখন ইউরোপের অধিকাংশ দেশ সোচ্চার তখন বিন লাদেনের টেপ আসলো।  ইন্টারনেটে বিপ্লবী বিবৃতি আসলো।  তথাকথিত চেচেন বিদ্রোহীরা মস্কোর থিয়েটারে জিম্মি নাটক মঞ্চস্থ করলো।  শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরনে হত্যা করা হলো স্পেনের শত শত মানুষকে।  ইউরোপের যেসব দেশ আমেরিকা-বৃটিশ আগ্রাসন ও ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাচ্ছিল, তারা পিছিয়ে গেল।  কেননা, এসব হামলা ও তাদের দায়িত্ব স্বীকারকারী টেপগুলো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিল যে, মুসলমানদের হাত থেকে কারোরই নিস্তার নেই।

বর্তমানে লাদেনকে হত্যার খবর এই সব ঘটনাগুলোকেই মনে করিয়ে দেয়। এই ধরণের খবর বা কাহিনী এমনিতে তৈরী হয় না, বরং এগুলো আসে একটা বড় ধরণের ঘটনার আগে। কি সেই ঘটনা, যা ঘটাবার জন্য এতো আয়োজন, তা জানার জন্য হয়তো আরো কিছুদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তা হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোন আগ্রাসন, হতে পারে পাকিস্তানের উপর বড় রকমের হামলা আবার হতে পারে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য সরানোর প্রস্তুতি।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in মুসলিম জাহান. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s