অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বসবাস – কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু ফতওয়া ও কিছু উপসংহার


লেখক – আবূ সামীহা

মুল লেখা এখানে

১.
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে আল-মদীনাহ স্কুলে আমার একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে প্রায় সময়ই।
“ভাইয়া, আপনি এবার কাকে ভোট দিচ্ছেন?”
“আমি ভোটার নই।”
“কেন?”
“আমি আমেরিকান নাগরিক নই।”
“আশ্চর্য! কেন নন? আপনি এত বছর আমেরিকায় আছেন! আপনার ইংরেজী উচ্চারণ শুনে আমরাতো মনে করেছি আপনি এখানেই জন্মেছেন ও বড় হয়েছেন।”
“আমি আমেরিকার নাগরিক হতে চাই নি, তাই।”
“কিন্তু কেন?”
“এটা তোমাদের বুঝানো বড় মুশকিল। আমার দ্বিতীয় মেয়েটা যদি অসুস্থ্য না হতো তাহলে আমি তোমাদের পড়ানো বাদ দিয়ে অনেক আগেই আমেরিকা ছেড়ে চলে যেতাম।”
“কিন্তু আপনি এখন যখন থেকেই গিয়েছেন তাহলে নাগরিক হয়ে যাচ্ছেন না কেন?”
“এটা তোমাদের কীভাবে বুঝায়? আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে হলে আমাকে শপথ নিতে হবে। এবং সে শপথে এমন কিছু কথা আছে যেগুলোকে আমি আমার বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করি।”

আমি ৯ম ও ১০ম ক্লাসে বিশ্ব-ইতিহাস ও ভূগোল পড়ায় আর ১১শ ও ১২শ ক্লাসে পড়ায় আমেরিকার ইতিহাস ও সরকার।  এজন্য আমার ছাত্র-ছাত্রীদের ধারণা আমার পক্ষে আমেরিকার নাগরিক হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আমার ক্লাসে তাদেরকে আমার বিষয় পড়ানোর সাথে সাথে ইসলামের প্রতি অনুরাগ, ভালবাসা ও কর্তব্যবোধের পাশাপাশি তাদের নাগরিক দায়িত্ববোধের কথাও স্মরণ করিয়ে দেই।  নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র থেকে সুবিধে আদায়কারীদের দলভূক্ত হলেই শুধু চলবে না; বরং নিজের কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্য থাকতে হবে সবার। আমি বলি “তোমরা এখানে জন্মেছ এবং এখানে বড় হচ্ছ, এবং সম্ভবত এখানেই থেকে যাবে আজীবন।  তাই তোমাদের চার পাশের পরিবেশের উপর তোমাদের প্রভাব থাকতে হবে। আল্লাহ এদের প্রতি তোমাদের কর্তব্য ঠিক করে দিয়েছেন। মানুষের কল্যাণকারী হিসেবেই যেন তোমাদেরকে দেখে তোমাদের সহ-নাগরিকরা।”

তাদের মুসলিম-আমেরিকান আইডেন্টিটিকে দৃঢ়তার সাথে ধারণ করতে আমি তাদের বলি।  এখন আমি নিজে যখন আমেরিকার নাগরিক শপথ নিতে পিছপা হই তখন তারা আবার প্রশ্ন তোলে, “তাহলে আমাদেরকে আপনি কেন শক্তভাবে এখানে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার অনুপ্রেরণা দেন?”
“কারণ তোমরা এখানে জন্মেছ, তোমরা চাইলেই সহজে অন্য কোথাও যেতে পারবে না। গেলেও সেখানে স্বাধীনভাবে দীন পালন যে করতে পারবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আর তোমাদেরকে আমার মত আনুষ্ঠানিকভাবে শপথের মাধ্যমে একটা রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করে নিতে হবে না।”
“কিন্তু আপনিতো আমাদেরকে অনুগত নাগরিক হিসেবে জীবন-যাপনের উপদেশ দেন।”
“তোমাদের  নাগরিক আনুগত্যের ক্ষেত্রে আমি তোমাদেরকে আল্লাহর নাফরমানি করার উপদেশতো দেই নি। দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে অধিকার ও কর্তব্যের সীমারেখা তোমরা মেনে চলবে। কিন্তু যেখানে আল্লাহ ও রসূলের সরাসরি  নাফরমানী করা হবে, তখন তা হবে নিজের উপর জুলুম। তা থেকে তোমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। আর নাগরিক হিসেবে তোমাদের কথা বলার অধিকার যখন আছে তখন সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যথা সময়েই প্রতিবাদ করতে হবে তোমাদেরকে। তেমন সৎসাহস নিয়েই তোমাদেরকে টিকে থাকতে হবে। তোমরা অবশ্যই দেশের ভেতরে বা বাইরে সরকারের কোন অন্যায় কাজের সহযোগী হবে না।”

২.
বিগত শতকের শেষ দশক পুরোটা কাটালাম মুসলিম দেশগুলোর উন্নয়নের মডেল হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়ায়। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার ছাত্র হবার সুবাদে শতাধিক দেশের মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল। এদের একজন ছিল বৃটিশ ছাত্র “ভাই আব্দুস-সালাম গ্রীন”।  তিনি বৃটিশ ইসলামী বক্তা আব্দুর-রহীম গ্রীনের ভাই কিনা জানি না। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করি নি তাঁর পরিবারের ব্যাপারে। আর আব্দুর-রহীমও তখন ইউটিউবের বদৌলতে পরিচিত ছিলেন না। তবে আব্দুস-সালাম এর পারিবারিক নাম ও চেহারা যা মনে আছে তাতে মনে হয় তাঁরা আত্মীয়ই হবেন। আব্দুস-সালাম আমাদের ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলেন; আর নিজের বৃটিশ স্ত্রী ও সন্তানদের মালয়েশিয়া নিয়ে এসেছিলেন ইসলামী পদ্ধতিতে বড় করার জন্য। এক সেমিস্টার পরে তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে বৃটেনে প্রত্যাবর্তনকে তাঁর পরিবারের ইসলামী পরিগঠনে অনেক সহায়ক মনে করলেন এবং বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

মালয়েশিয়ান ইসলামী যুব আন্দোলন – আবিম [Angkatan Belia Islam Malaysia –ABIM] কর্তৃক আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ব্রাদার আব্দুস সালাম যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হচ্ছেঃ “আমি মালয়েশিয়া এসেছিলাম আমার সন্তানদেরকে ইসলামী পরিবেশে বড় করে তোলার জন্য। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বৃটেনে ফিরে যাবার, কারণ বৃটেনের শিশু-কিশোর ও তরুণদের জীবন-যাপন এর ধরণ আর মালয়েশিয়ান শিশু-কিশোর-তরুণদের জীবন-যাপন প্রণালীতে বাহ্যত কোন পার্থক্য নাই। বৃটেনে আমার ছেলে-মেয়েরা যখন এই জীবন প্রণালী দেখে তখন আমি তাদের বলতে পারি এটা অমুসলিমদের জীবন প্রণালী। আমরা মুসলিম; সুতরাং আমাদের জীবন-যাপন প্রণালী তাদের থেকে ভিন্ন। কিন্তু আমার ছেলে-মেয়েরা  যখন একই প্রশ্ন এখানে করে তখন তাদের জবাব দেবার মত কোন কথা আমার থাকে না। তাই বৃটেনই তাদের জন্য ভাল, কারণ সেখানে তারা তাদের ইসলামী আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে বড় হতে পারবে।”

৩.
সপ্তাহখানেক আগে কথা হচ্ছিল সদ্য বাংলাদেশ ফেরত একজন ভাইয়ের সাথে। তিনি তাঁর জুনিয়র হাই ও হাইস্কুলে পড়ুয়া দুই ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে।  বাংলাদেশ দেখার পর তারা তাদের আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছে “এটা কি আসলে মুসলিমদের দেশ?” তাদের পিতা “কেন?” জানতে চাইলে তারা বলল “এখানে এত অসংখ্য মহিলাদের দেখেছি বিভিন্ন জায়গায়; কিন্তু তারাতো হিজাব পড়ে নি।” এই ছেলেগুলো মুসলিম মহিলা মানেই হিজাবী বলেই জানে এবং সেভাবে নিজেদের চিন্তা চেতনাকে গড়ে তুলেছে। সেজন্য খুব আগ্রহভরে নিজের পিতৃ-পুরুষের দেশে গিয়েছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত তাদের শেখা ইসলামের অনুপস্থিতিই তারা দেখেছে সেখানে। নিউ ইয়র্কের রাস্তায়, স্কুল, ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যত হিজাবী মুসলিম মহিলা দেখা যায় সে অনুপাতে ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত দেশে তারা তা দেখতে পায় নি। ফলে তারা সন্দেহ করেছে সেটা  আদৌ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কিনা।

৪.
আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ থেকে হিজরত করে চলে যাবার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফতওয়া দেখি। এই ব্লগেও অনেকে এসব ফতওয়া প্রকাশ করেন। আসলে কোন দেশ মুসলিম বা অমুসলিম হয় না। রাষ্ট্র ইসলামিক বা অনৈসলামিক হতে পারে। ফিক্বহের বিবর্তনের ধারায় আমাদের আগেকার উলামাগণ এক সময় পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলোকে দারুল ইসলাম ও দারুল হারব [দারুল কুফর] হিসেবে ভাগ করেছেন। এই কন্সেপ্ট এখনো থাকতে পারে। শর্ত হচ্ছে দারুল ইসলাম থাকতে হবে আগে। দারুল ইসলাম থাকলেই দারুল হারবের ধারণা বর্তমান থাকবে। মনে রাখতে হবে ফিক্বহ সব সময় বিবর্তনশীল।  ফিক্বহী রায় স্থান, কাল ও পাত্রের অবস্থার ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয়। কিতাব ও সুন্নতের মূলনীতি ঠিক অপরিবর্তিত থাকার পরে এগুলোর প্রায়োগিক ফিক্বহী সিদ্ধান্ত হয় পরিবর্তনশীল। কিতাব ও সুন্নতের টেক্সট প্রয়োগের ক্ষেত্রে এজন্য আমাদের ক্লাসিকাল ও সমকালীন ফকীহদের সবাই “মাক্বাসিদ আশ-শরীয়াহ” এর উপর জোর দেন। এর ধারাবাহিকতা আমরা সাহাবাদের [রাদিয়াল্লাহু আনহুম] সময় থেকেই দেখতে পাই। এ জন্য কিতাবে চোরের হাত কাটার কথা থাকলেও উমর [রাঃ] তা অবস্থার আলোকে স্থগিত করেন। কিতাবে মন জয় করার জন্য জাকাতের অর্থ কিছু ব্যক্তিদের দেয়ার কথা থাকলেও উমর [রাঃ] তা দিতে অস্বীকার করেন, কারণ ঐ হুকুমের মাক্বসাদ তিনি জানতেন।

কিতাব ও সুন্নতকে আক্ষরিক অর্থে যাঁরা গ্রহণ করেন তাঁরা বলবেন উমর [রাঃ] কিতাবের বিপরীত করেছেন। কিন্তু শরীয়তের মাক্বাসিদ যাঁরা জানেন, তাঁরা জানেন এবং বুঝেন যে তিনি সঠিক কাজই করেছেন। তাঁরা জানেন যে উমরের [রাঃ] এই সিদ্ধান্তগুলো বিশেষ স্থান, কাল ও অবস্থার উপর ভিত্তি করেই ছিল। স্থান, কাল, পাত্র ও অবস্থা ভেদে এগুলোর প্রয়োগ আবার অন্যরকম হবে। এভাবে দারুল ইসলাম ও দারুল কুফরের সে সাদা-কালো অবস্থানও আজকাল অনেক ক্ষেত্রে খাটে না। আমাদের সমকালীন অনেক উলামা তাই অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিম অধ্যুষিত দেশকে “দারুদ-দাওয়াহ” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

রসূলুল্লাহ (সঃ) এর সময় মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এবং খুলাফা’ আর-রাশিদাহ এর সময়ে ও তার পরবর্তী বেশ কিছুকাল এই বিভাজন ভালভাবেই বুঝা যেত। রসুলুল্লাহর [সঃ] সময়ে হিজরত করে মদীনায় না আসা ঈমানের পরিচয় বহন করত না। অবশ্য মক্কা বিজয়ের পর তিনি বলেছেন, “আজকের পর আর কোন হিজরত নেই; কিন্তু জিহাদ ও নিয়্যত অবশিষ্ট আছে। আর যখন তোমাদেরকে জিহাদের জন্য বের হতে বলা হবে তখন তোমরা বেরিয়ে পড়বে।” [১] আমাদের সময়ে যাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ থেকে হিজরত করে আসাকে জরুরী মনে করেন তাঁরা  দলীল হিসেবে রসুলুল্লাহর [সঃ] একটা হাদীস ব্যবহার করেন। তা হচ্ছেঃ
“আমি ঐ সমস্ত মুসলিমদের থেকে মুক্ত যারা মুশরিকদের মাঝে অবস্থান করে।”[২] তাঁরা আরো একটি দলীল ব্যবহার করেন; আর তা হল সূরা নিসার ৯৭ নং আয়াত, যেখানে বলা হয়েছেঃ “যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলেঃ এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলেঃ আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হল জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান।” [৩]

উপরোল্লিখিত হাদীসের ব্যাপারে কথা হচ্ছে, এটির সহীহ হওয়া বিতর্কিত। আগের দিনের ইমামদের অনেকেই, আল-বুখারী সহ, এটিকে দূর্বল বলেছেন। আমাদের সময়ের আল-আলবানী এটিকে সহীহ বলেছেন। আমরা যদি ধরে নেই এটি সহীহ্, তাহলেও এর পেছনে ঘটনা আছে। আর তা হলঃ মুসলিম মুজাহিদদের একটা দল একটা আরব গোত্রকে আক্রমন করলে সেখানে কিছু মানুষ নিহত হয়। পরে জানা যায় যে নিহতদের মধ্যে তাদের গোত্রের কিছু মুসলিমও ছিল। রসূলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে এই ব্যাপারে খবর পৌঁছুলে তখন তিনি এমন মন্তব্য করেন। অর্থাৎ তাদের রক্তের ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবীরা দায়ী নন।

সূরা আন-নিসার ৯৭ নং আয়াতেরও একটা প্রেক্ষাপট আছে। এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে উলামারা উল্লেখ করেছেন কিছু মুসলমানের কথা, যারা দেশপ্রেম ত্যাগ করে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেনি। এদের মধ্যে ছিল আলী ইবন উমাইয়া ইবন খালাফ, আবূ কায়স ইবন ওয়ালিদ ইবন মুগীরা, আবু মনসুর ইবন হাজ্জাজ ও হারিস ইবন জাম‘আ। এরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু নিজেদের দেশ ও আত্মীয়-স্বজনের মায়া ছেড়ে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে হিজরত করেনি। শেষ পর্যন্ত এরা মুশরিকদের সে বাহিনীর সাথে মিলে বদরে এসেছিল যা মুসলমানদের ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর ছিল। যুদ্ধে এরা নিহত হলে মুসলমানরা বলাবলি করছিলেন এদের কী হবে কারণ এরাতো মুসলমান ছিল? এরা যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রও ধারণ করে নি। কিন্তু মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত কোন তীরের আঘাতে অথবা কারো তরবারির বিক্ষিপ্ত আঘাতে এরা নিহত হয়। এরা যাদের সাথে ছিল তাদের সাথেই তাদের পরকালীন পরিণতি। এদের সম্পর্কে এবং বদরে বন্দী হওয়া কুরাইশদের পক্ষের লোকদের মধ্যেকার মুসলিম দাবীদারদের ব্যাপারেই এ আয়াত নাজ়িল হয়েছে। [৪] আয়াতের শুরুর দিকটা লক্ষ্য করুনঃ “যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে,” অর্থাৎ তারা মুশরিকদের সঙ্গী হয়েছে মু’মিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। এখানে ফিরিশতারা তাদেরকে তিরস্কার করছিল তাদের গোনাহের জন্য। এরপর তারা যখন ওজর পেশ করছিল তখন তাদেরকে বলা হয়েছে কেন তোমরা হিজরত কর নি?

এ জন্য কোন ব্যক্তি জখন কোথাও অবস্থান করে এবং তার দীন পালন করতে কোন সমস্যা না হয় এবং তাকে আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হতে না হয় তাহলে তার হিজরতের কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহর প্রশস্ত জমীনের যেখানেই মু’মিনের পক্ষে তার ঈমান ও দীনের হিফাজত করা সম্ভব সেখানেই সে যাবে এবং থাকবে। সুনান আত- তিরমজীর ব্যাখ্যা [শরহ্] “তুহফাতুল আহওয়াজী শরহ্ সুনান আত-তিরমিজী” তে উপরোল্লিখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় উলামারা কী লিখেছেন/বলেছেন আসুন আমরা তা দেখি।
“ইমাম খাত্তাবী [রঃ] ও অন্যরা বলেছেনঃ যারা ইসলাম গ্রহণ করত তাদের জন্য ইসলামের প্রথম দিকে হিজরত ফরজ ছিল কারণ মদীনায় তখন মুসলমানদের সংখ্যা কম ছিল এবং তাদের এক জায়গায় জমা হওয়া ছিল জরুরী। এরপর আল্লাহ যখন মক্কাকে খুলে দিলেন [বিজিত করে দিলেন] এবং মানুষ দলে দলে ইসলামে ইসলামে প্রবেশ করতে থাকল তখন মদীনায় হিজরত করার ফরজ রহিত হয়ে যায়। আর যাদের উপর শত্রু নাযিল হবে তাদের জন্য জিহাদ ও নিয়্যতের ফরজ বাক্বী থেকে যায়। নতুন ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর হিজরত ওয়াজিব হওয়ার পেছনে আরো যে হিকমাহ ছিল তা হচ্ছে সে যেন নিজের দেশে কাফিরদের নিপীড়ন থেকে নিরাপদ থাকতে পারে, কারণ কাফিররা তাদের দেশে যারা মুসলিম হচ্ছিল তাদেরকে শাস্তি দিচ্ছিল যাতে করে তারা তাদের দীন থেকে ফিরে আসে। আর এদের ব্যাপারেই নাজিল হয়েছিলঃ “যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলেঃ এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলেঃ আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে?” আর হিজরতের হুকুম এখনো তাদের জন্য বাক্বী রয়ে গেছে যারা দারুল কুফরে ইসলাম গ্রহণ করে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে যাবার সামর্থ রাখে।” [পৃষ্ঠা ১৭৮]

এখান থেকে আমরা কী দেখি? এমন সব জায়গা থেকেই মুসলিমকে হিজরত করতে হবে যেখানে তাকে তার দীনের ব্যাপারে ফিতনায় নিক্ষেপ করা হবে এবং আল্লাহর নাফরমানী করতে বাধ্য করা হবে। যদি এমন না হয় তাহলে তার সেখান থেকে হিজরত করার কোন জরুরত নেই। এজন্যই রসূলুল্লাহ্ (সঃ) প্রথম তাঁর সাথীদেরকে হিজরত করতে খৃষ্টান অধ্যুষিত আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জানতেন সেখানে তাদেরকে তাদের দীনের ব্যাপারে ফিতনায় নিক্ষেপ করা হবে না; বরং তারা নিরাপদে তাদের দীন পালন করতে পারবে। এমনকি মদীনায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও দীর্ঘদিন রসুলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে মদীনায় ডেকে পাঠান নি। তাঁরা মদীনায় আসেন খায়বার বিজয়ের পরে। রসূলুল্লাহ (সঃ) এর এক সাহাবী ফুদাইক্বকে [রাঃ] তিনি তাঁর কওমের সাথেই থেকে যাবার অনুমতি দেন,  যখন এটা জানা গেল যে ফুদাইক্বের ক্বওম তার দীন পালনে কোন বাধা দেবে না এবং তিনি তাদের মাঝে নিরাপদেই অবস্থান করবেন। তবে তিনি (সঃ) তাঁকে নির্দেশ দেন তিনি যেন গোনাহ ও সীমালংঘন মূলক আচরণ থেকে বিরত থাকেন। [৫]

মালিকি ও জাহিরী মাযহাবের মত হচ্ছে একজন মুসলিমকে অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্রে হিজরত করতে হবে। কিন্তু হানাফী, শাফি’ঈ ও হাম্বলী মাজহাবের মত হচ্ছে হিজরত জরুরী নয় যদি ব্যক্তির দীন পালনে কোন সমস্যা না হয়। ইমাম আল-মাওয়ার্দীসহ [রঃ] শাফি’ঈদের একটা গ্রুপের মত হল একজন মুসলিমের অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে থাকা  বরং জরুরী যদি সে সেখানে ইসলাম পালন করতে পারে, কারণ তা না হলে ঐ দেশ মুসলিম শূন্য হয়ে যাবে। [৬]

আমাদের সময়টাই এমন যে এখন অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বসবাস করা নিয়ে কোন সাধারণ ফতোয়া দেয়া যায় না। আমাদের যে সমস্ত ভাইয়েরা এখানে এ জাতীয় দেশে বসবাস করাকে হারাম ঘোষণা করার ফতওয়া জারী করেন যখন তখন তারা www.islam-qa.com এর একটা ফতওয়া [নং ১৩৩৬৩] ব্যবহার করেন প্রায়। কিন্তু সেই ফতওয়াটা কেউ যদি পুরো পড়েন তাহলে সেখানে দেখবেন লিখা আছে নীচের কথাগুলোওঃ
“সুতরাং যেহেতু কাফিরদের দেশগুলোর মত মুসলিম দেশগুলোও একটা থেকে আরেকটা ভিন্ন এবং আরো এজন্য যে ভিসা ও কঠোর বসতি নিয়ন্ত্রণ আইন, ইত্যাদির জন্য একজন মুসলিম চাইলেই কোন দেশে যেতে পারবে না; এবং এমনও হয় যে একজন কোন মুসলিম দেশে নিজের দীন পালন করতে পারে না অথচ  অমুসলিম দেশে সে ওটা পুরোপুরি বা আংশিক পালন করতে পারে — এ সমস্ত কারণে এমন কোন সাধারণ ফতওয়া দেয়া সম্ভব নয় যা সব দেশ ও সব ব্যক্তিকে বিবেচনায় আনবে। আমরা বরং বলব প্রত্যেক মুসলিমের জন্য রয়েছে তার নিজস্ব অনন্য পরিস্থিতি ও বিশেষ ফতওয়া যা শুধু তার জন্য প্রযোজ্য; আর প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের জন্য দায়ী। যদি তিনি নিজের বসবাস করা মুসলিম দেশে নিজের দীন কাফির দেশে বসবাস করার চাইতে ভাল করে পালন করতে পারেন তবে তার জন্য কাফির দেশে বসবাস জায়েজ নেই। কিন্তু ব্যাপারটা যদি অন্যরকম হয় তাহলে তার জন্য কাফির দেশে বসবাস জায়েজ, তবে শর্ত হচ্ছে তাকে এতটুকু আত্মবিশ্বাসী হতে হবে যে সে নিজের বাসনা ও সেখানকার অনৈতিক প্রলোভন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে পারবে এবং যার জন্য সে শরীয়ত নির্ধারিত প্রয়োজনীয় সাবধানতা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

নীচে আমাদের উপরোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে উলামাদের কিছু মন্তব্য উল্লেখ করা হলঃ
শায়খ ইবন উসায়মীন [রঃ] কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ “বর্তমান কালে এটা একটা খুবই কঠিন বিষয় কারণ দেশগুলো বিভিন্ন রকম এবং কিছু মুসলিমের অবস্থা এমন যে তারা যদি তাদের নিজ দেশে ফিরে যায় তবে তারা নির্যাতনের শিকার হবে; অন্যদিকে কাফির দেশে তারা এ ব্যাপারে নিরাপদ। তাই আমরা যদি বলি যে কাফিরদের মধ্যে বাস করা তাদের জন্য হারাম তাহলে কোথায় সেই ইসলামী রাষ্ট্র যা তাদের গ্রহণ করবে এবং তাদেরকে সেখানে বসবাসের সুযোগ করে দেবে?”

যাকারিয়া আল-আনসারী আশ-শাফি’ঈ তাঁর কিতাব আসনা আল-মাতালিব [৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৭] এ লিখেছেনঃ যাদের সামর্থ আছে তাদের জন্য কাফির দেশ থেকে মুসলিম দেশে হিজরত করা জরুরী যদি তারা খোলাখুলি নিজেদের দীন পালন করতে না পারে

ইমাম ইবনুল-আরাবী আল-মালিকী [রঃ] বলেছেনঃ হিজরত মানে হচ্ছে দারুল-হরব থেকে দারুল ইসলামে গমন। রসূলুল্লাহর সময়ে এটা ফরয ছিল এবং এখনও এটা ফরজ তাদের জন্য যারা তাদের জীবনের ভয় করে। [আশ-শওকানী, নাইলুল-আওতার, ৮ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৩৩]

“মুশরিকদের মাঝে বসবাসকারী প্রত্যেক মুসলিম থেকে আমি সম্পর্কহীন” হাদীস সম্পর্কে ইমাম ইবন হাজার আল-আসক্বালানী বলেছেনঃ এটা তাদের ব্যাপারে বুঝতে হবে যারা তাদের দীন পালনের ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়। [ফতহুল বারী, ২৮২৫ নং হাদীসের ব্যাখ্যা]

আল-মাওসু’আহ আল-ফিক্বহিয়্যাহ [২০ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৬] কিতাবে বলা হয়েছেঃ
দারুল -হারব এমন প্রত্যেক স্থানকেই বুঝায় যেখানে কুফরী শাসন প্রবর্তিত। দারুল-হারবের ব্যাপারে একটা ফতওয়া হচ্ছে এর সাথে হিজরত জড়িত। দারুল হরব থেকে হিজরতের ব্যাপারে ফক্বীহগণ তিন ধরণের মত দিয়েছেনঃ
[ক] যাদেরকে অবশ্যই হিজরত করতে হবেঃ যারা দারুল হরবে প্রকাশ্যে নিজের দীন পালন করতে পারে না এবং সেখান থেকে হিজরত করার সামর্থ রাখে। এমন কি যে নারীর মাহরাম নেই এবং সে মনে করে যে সফর করা নিরাপদ অথবা সফর করা দারুল হরবে থেকে যাওয়ার চেয়ে নিরাপদ তাকেও হিজরত করতে হবে।

[খ] হিজরত করতে যারা বাধ্য নয়ঃ এরা হচ্ছে তারা যারা হিজরত করতে সক্ষম নয়; কারণ হয় তারা অসুস্থ অথবা তাদেরকে কাফির দেশে থেকে যেতে বাধ্য করা হয়েছে অথবা যারা দূর্বল, যেমন নারী ও শিশু কারণ আল্লাহ বলেছেন, “কিন্তু পুরুষ, নারী ও শিশুদের মধ্যে যারা অসহায়, তারা কোন উপায় করতে পারে না এবং পথও জানে না।” [৪ঃ৯৮]

[গ] যাদের জন্য হিজরত ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব্বঃ এরা হচ্ছে ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা হিজরত করার ক্ষমতা রাখে আবার দারুল হরবে থেকে খোলাখুলি নিজেদের দীন পালনও করতে পারে। এই ব্যক্তিদের জন্য দারুল ইসলামে হিজরত করা মুস্তাহাব্ব এ জন্য যে তারা মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি করবে এবং জিহাদে অংশ গ্রহণ করবে।

স্ট্যান্ডিং কমিটির এক ফতওয়াতে [২০ খণ্ড, ৫০ পৃষ্ঠা] বলা হয়েছেঃ এক ব্যক্তি একটা মুশরিক দেশ থেকে অন্য আরেকটা মুশরিক দেশেও হিজরত করতে পারে যেখানে খারাবী কম এবং মুসলিম হিসেবে তার জন্য বিপদ কম, যেমন রসূলুল্লাহ {সঃ] মুসলিমদের মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে বলেছেন। [৭]
[www.islam-qa.com ]

উপরের এই দীর্ঘ আলোচনা থেকে আমরা যে উপসংহার টানতে পারি তা হচ্ছেঃ
১. আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে কুফরী বিধান দিয়ে যে সমস্ত দেশ পরিচালনা করা হয় তার সবগুলোই দারুল-হারব।
২. মুসলিম কিছু নির্দিষ্ট কারণ ব্যতিরেকে দারুল ইসলাম থেকে দারুল কুফরে বসবাস করার জন্য চলে যাবে না।
৩.  সামর্থবান মুসলিমদের জন্য দারুল হারব থেকে দারুল-ইসলামে হিজরত করা  ফরজ যদি তারা দারুল হরবে খোলাখুলিভাবে নিজেদের দীন পালন করতে না পারে।
৪. যারা দারুল কুফরে অবস্থান করে নিজেদের ঈমান ও আমল হিফাজত করতে পারবেনা তারা অবশ্যই দারুল কুফর ত্যাগ করবে।
৫. দারুল হরবে খোলাখুলি দীন পালন করতে পারলে দারুল ইসলামে হিজরত করা জরুরী নয়।
৬. যদি দারুল ইসলাম বর্তমান থাকে তাহলে খোলাখুলি দীন পালন করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও মুসলিমের জন্য দারুল হরব থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করা মুস্তাহাব্ব কারণ সে মুসলিমদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং জিহাদে অংশ নিতে পারবে।
৭. অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর দারুল হরবে বেশি ক্ষতিকর দারুল হরব থেকে হিজরত করা যাবে।

এই সব কিছুর আলোকে আমরা আমাদের ঐ সমস্ত ভাইদের বলব,  যারা মুসলিমদেরকে অমুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ দেশ থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্য ফতওয়ার পর ফতওয়া দিয়ে যাচ্ছেন, “আপনাদের মতটা আমাদের উলামাদের মতের আলোকে কীভাবে টিকে? আপনারা কীভাবে একটা সাধারণ ফতওয়া জারী করেন?  মুসলিমরা হিজরত করে কোথায় যাবে? ভারত, বার্মা ও চীনের নির্যাতিত মুসলমানদেরকে [প্রায় ৩০ কোটির মত] কোন দারুল ইসলাম গ্রহণ করবে? কোন দারুল ইসলাম ঐ সমস্ত মুসলিমদের গ্রহণ করার জন্য তৈরি আছে,  যে সমস্ত মুসলমানরা অমুসলিম দেশে বসবাস করে স্বাধীনভাবে তাদের দীন পালন করতে পারছে কিন্তু হিজরত করার সামর্থ থাকার কারণে জিহাদে অংশ নিতে আকাংখিত হয়ে মুসতাহাব্ব হিজরত করার জন্য তৈরি হয়ে বসে রয়েছে? সুতরাং এটা কী আপনাদের জন্য উচিৎ হবে না যে এ ব্যাপারে চুপ থাকা এবং ব্যক্তি মুসলিমদের নিজেদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া?”

আমারতো মনে হয় এ জাতীয় বাছ-বিচার বিহীন সাধারণ ফতওয়া মূলত মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক চক্রান্তের অংশ। পূর্ব ও পশ্চিমের অনেক অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এখন বিপুল সংখ্যক মুসলিমের বসবাস। হয়তো আমাদের আমাদের শত্রুরা চায় যে এই দেশগুলো মুসলিম শূন্য হয়ে যাক। তাই এ জাতীয় সাধারণ ফতওয়া তাদের চক্রান্তকে বাস্তবায়নে খুবই সহায়ক হবে।

অন্যদিকে যে সমস্ত মুসলিমরা অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে যে কারণেই গমন করেছেন না কেন তাদের উচিৎ নিজেদের দীনী আত্মমর্যাদাকে ভুলে না যাওয়া। তাদের কোনভাবেই উচিৎ হবে না কাফির সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে অর্থনৈতিক সুবিধা ও সামাজিক  মর্যাদার স্বার্থে নিজেদের মুসলিম কমিউনিটি থেকে দূরে গিয়ে একাকী অবস্থান করা। তাদের উচিৎ এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাতে তারা এবং তাদের সন্তানরা দীনের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। কাফির দেশে থাকলে সেখানেও থাকবে যেখানে মুসলিম কমিউনিটি রয়েছে;  রয়েছে মসজিদ, ইসলামী শিক্ষা ও মুসলিম জীবন-যাপনের উপকরণ। মুসলিমদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনভাবেই একাকী অবস্থান করবে না; যার ফলে মুসলিম জীবন ধারা সম্পর্কে বেখবর হয়ে যাবেন তিনি। আর কোনভাবেই আল্লাহর না-ফরমানী মূলক কাজে [সুদ, মদ, জুয়া, হারাম চাকরী, ইত্যাদি] ইচ্ছাকৃত ভাবে জড়িয়ে যাবে না। যাদের এমন সম্ভাবনা আছে তাদের অবশ্যই এমন স্থানে হিজরত করা উচিৎ যেখানে আল্লাহর নাফরমানীর উপকরণ সীমাবদ্ধ। তাদের আরো উচিৎ ঐ সমস্ত দারুল ইসলামে হিজরত করার জন্য সবসময় তৈরি থাকা যার শাসক ও অধিবাসীগণ শরীয়ত বাস্তবায়ন করেন, তাদের দেশকে ইসলামের দূর্গ হিসেবে গড়ে তুলে ইসলামের জিহাদের জন্য তৈরিতে সচেষ্ট এবং মুসলিমদের গ্রহণ করতে তারা আগ্রহী। সে সব দারুল ইসলামে সামর্থবান মুসলিমদের অবশ্যই হিজরত করা উচিৎ যাতে সেগুলো দক্ষ জনবল এবং অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধিতে ভরপূর হয়ে উঠে ইসলামের গৌরবের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ওয়াল্লাহু আ’লামু বিস-সাওয়াব।

পাদটীকাঃ
[১]
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَوْمَ الْفَتْحِ لَا هِجْرَةَ بَعْدَ الْفَتْحِ وَلَكِنْ جِهَادٌ وَنِيَّةٌ وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ فَانْفِرُوا
[২]
আবূ দাঊদ সামূরা (রাঃ) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন, ইমাম তিরমিজীও এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
أَنَا بَرِيءٌ مِنْ كُلِّ مُسْلِمٍ يُقِيمُ بَيْنَ أَظْهُرِ الْمُشْرِكِينَ
[৩]
আল্লাহ বলেছেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ ۖ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْ‌ضِ ۚ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْ‌ضُ اللَّـهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُ‌وا فِيهَا
[৪]
দেখুন, তাফসীর ইবন কাসীর, [৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ট ও ৭ম খণ্ড], সপ্তম সংস্করণ পৃষ্ঠা ৫৩০-৫৩১; [২০০৭]। তাফসীর পাব্লিকেশন কমিটি, ঢাকা।
[৫] এটি হাসান হাদীস যা  সহিহ ইবনে হিব্বান এবং সুনান বায়হাক্বীতে বর্ণিত হয়েছে।
[৬] শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায়্যাহ এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেনঃ
http://en.islamtoday.net/artshow-382-3303.htm
[৭] http://www.islam-qa.com/en/ref/13363/

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in আলোচনা. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s