:: ইমান ::


মনের দুঃখে প্রায় কাঁদতে কাঁদতেই হাসপাতাল থেকে বের হল আব্দুল। সবাই তাকে আব্দুল চাচা বলে। পাড়ার ছোট বাচ্চা থেকে বুড়ো সবার আব্দুল চাচা সে। ঠেলা গাড়ি চালিয়ে, মাল পত্র বয়েই তার দিন কাটে। প্রথ্যেকদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সে কাজ করে। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও সে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তে ভুলে না। ঠিক সময়ই সে নামাজ পড়ে। আল্লাহ এবং রাসুল(সা.) এর প্রতি তার গভীর বিশ্বাস।কচি কচি দুটি মেয়ে এবং স্ত্রীর সাথে একটি কুঁড়ে ঘরে সুখে শান্তিতেই ছিল আব্দুল। সারাদিন ঠেলা চালিয়ে একশ টাকার উপরে কামায় হত তার। সে কখনও বড়লোক হতে চাইনি। যা আছে তাতেই সুখী সে।

কিন্তু সেই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হল না। শান্ত মরুভুমিতে যেভাবে বালি ঝড় ওঠে ঠিক সেই ভাবেই তাদের সুখের সংসারে ঝড় উঠল। একদিন রাতে তার ছোট মেয়ে আয়েষার হঠাত প্রচন্ড বুক ব্যাথা হল। এর আগেও অনেক বার হয়েছিল, তখন রাম বাবুর দোকান থেকে ব্যাথার ট্যাবলেট খায়িয়েই ঠিক হয়েছে। কিন্তু আজ ব্যাথার ট্যাব্লেট কোন কাজ করল না।

 শেষে বাধ্য হয়ে হাসপাতাল নিয়ে যেতে হল। ডাক্তার প্রায় ঘন্টা খানেক পরীক্ষা করার পর বললেন হার্টে ফুটো আছে। শীঘ্রই অপারেশান করতে হবে নইলে যেকোন সময় অঘটন ঘটতে পারে। আব্দুল কাতর ভাবে ডাক্তার বাবুকে জিজ্ঞেস করলে অপারেশানে খরচ কেমন হবে। ডাক্তার বাবু বললেন প্রায় লাখ খানেক টাকা লাগবে। শুনেই চমকে উঠল আব্দুল। জীবনেও কখনো একলক্ষ টাকা একসাথে দেখেনি সে। এত টাকা সে কোথায় পাবে। ডাক্তারের সামনেই কাঁদতে লাগল। কাকুতি মিনতি করল ডাক্তারের কাছে যাতে কম টাকা নেয়। সে তো ঠেলা চালায়, যা কামায় তাতে তো সংসারই ভালো ভাবে চলে না। এই তো কিছু দিন আগেই ইদ গেল। কিছুই নেয়নি তার স্ত্রী এবং তার নিজের জন্য। অনেক কষ্ট করে দুই মেয়ের জন্য ফ্রক কিনেছিল। আর অল্প সামাই, মিষ্টির ব্যবস্থা করেছিল।

 আব্দুলের কান্না কাটি, আয়েষার মিষ্টি মুখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার নিজের হাসপাতালের চার্জ এবং নিজের ফিস নেবে না বলল। কিন্তু তারপরেও প্রায় সত্তর হাজারের মতো টাকা লাগবে। যা আব্দুলের মতো লোকের পক্ষে জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। ডাক্তার বলল একসপ্তাহের মধ্যে অপারেশান করতে হবে। তা না হলে অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাবে। সে জানে রাত দিন ঠেলা চালিয়েও সে সত্তর হাজার টাকা জোগাড় করতে পারবে না।

  যেসব মালিকের কাছে আব্দুল কাজ করে তাদের কাছে গিয়েও কোন লাভ হল না। তারা কেউ এত পরিমান টাকা দিতে রাজি হল না। এমনকি তার অর্ধেক দিতেও রাজি নয় কেউ। তারা জানে আব্দুলের মতো লোকের পক্ষে সে টাকা শোধ করা সম্ভব নয়। তাই তারা তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আব্দুল মনে মনে ভাবে আগের যুগের মহাজন জমিদার আর এযুগের এসব মালিকদের মধ্যে কোন তফাত নেই। সবাই শুধু চুষে খেতে জানে।

  কয়েকদিন ঘুরে কোন কুলকিনারা না পেয়ে ঠিক করল তার একমাত্র সম্বল ভিটে বাড়ি খানা বিক্রি করবে। কয়েকজন দেখে গেলেও কেউ চল্লিশ হাজার টাকার বেশি দিতে চায়নি। আজিজ ভাই কিছুদিন আগে দোকান করবে বলে বাড়িটা কিনতে চেয়েছিল ষাট হাজার টাকায়। আজ সেও বলছে চলিইশের বেশি দিবে না। আব্দুলের বিপদে সবাই ফায়দা উঠাতে চায়। সেই জন্যেই হয়ত কেউ বলেছে ‘হাতি যখন দয়ে পরে চামচিকেতেও লাথি মারে’।

আব্দুল মনে মনে ভাবে আর কোন উপায় নাই, চল্লিশেই তাকে বাড়ি বিক্রি করতে হবে। কিন্তু আরও তিরিশ হাজার টাকা কোথা থেকে আসবে? আব্দুল পাড়ার জালসায় শুনেছিলেন ‘আল্লাহ আবশ্যই কোন সম্প্রদায়ের অবস্থার পরিবর্তন করেন না যতক্ষন না সেই সম্প্রদায় নিজেই নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টা না করে’। তাই আব্দুল চেষ্টা করেছিল নিজেই কোন ভাবে টাকা জোগাড় করার। কিন্তু এখন সে নিরুপায়। আব্দুল আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলো যাতে যে করেই হোক টাকার জোগাড় হয়ে যায়। কারণ সে তার ছোট মেয়েকে খুব ভালোবাসে তাকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না।

 এদিকে  মেয়ের চিন্তায় কেঁদে কেঁদে প্রায় আধ্মরা হয়ে গেছে আয়েষার মা জুবেইদা। আব্দুলের ভয় হচ্ছে আয়েষার কিছু হয়ে গেলে হয়ত জুবেইদাও আর বাঁচবে না। মেয়ের মৃত্যুর শোকে ধীরে ধীরে মৃত্যু নামক লক্ষ্যের দিকে তার স্ত্রী এগিয়ে চলবে। আয়েষার কিছু হলে হয়ত পুরো সংসারটাই ছাড়খার হয়ে যাবে।

  এভাবেই কয়েকদিন কেটে গেল। কাল অপারেশানের কথা। আল্লাহর কাছে দো’আ করা ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি সে। যা টাকা আছে তাতে কিছুই হয়ে উঠবে না। আজিজ ভাইয়ের কাছে ভিটে বাড়ির টাকা এখনো নেয়নি সে। ভেবেছিল কোথাও থেকে টাকা জোগাড় করে যদি ভিটে বাড়ি খানা বাচানো যায়। কিন্তু কোন উপায় নাই। এখন ভাবছে কাল সকালে গিয়ে টাকা নিয়ে আসবে। চল্লিশ হাজার টাকা ডাক্তারকে দিয়ে বলবে বাকি টাকা ধীরে ধীরে শোধ করে দেবে। তবে ডাক্তার রাজি হবে কিনা সে জানে না। যদি রাজি না হয় তবে কি হবে….এসব ভাবতে ভাবতে সে বাড়ির দিতে এগোতে লাগল। দেখল রাস্তা একেবারেই শুনসান। বুঝতে পারল ৪-৫ ঘন্টা ধরে এখানেই বসে ছিল সে। রাত ১২-১টা না হলে রাস্তা এমন শুনসান হয়না।

  একটু এগোতেও দেখল রাস্তার ধারে ঝোপে কয়েক জন বসে খুব ধীরে ধীরে গল্প করছে। কৌতুহলি হয়ে সে এগিয়ে গেল তাদের কাছে। কাছে এসে তাদের কথা শুনে চমকে গেল সে। এরা আসলে চোর। একটা বাড়ি থেকে দের লক্ষ টাকা চুরি করে এসেছে। আব্দুল ভাবলো পুলিশে খবর দিবে। তখনই সাইরেন বাজিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি এগিয়ে আসছিল এই দিকে। সাইরেন শুনেই চোর গুলো যেদিকে পারল পালিয়ে গেল। আব্দুলের মতো চোর গুলোও ভেবেছিল পুলিশ তাদের কাছে আসছে। কিন্তু পুলিশের গাড়িটা ফুল স্পিডেই চলে গেল। আব্দুল কিছু না ভেবেই ব্যাগটা নিয়ে সরে পড়ল সেখান থেকে।

আব্দুল ভাবলো চোর গুলো এসে যদি দেখে ব্যাগ নেই তখন তাড়া ভাববে ব্যাগ পুলিশে নিয়ে গেছে। কারণ সে যে ওখানে ছিল সেটা কেউ টের করতে পারেনি। খুশিতে সে তাড়াতাড়ি হাসপাতালের দিকে এগিয়ে চলল। এখনই সে টাকা দিয়ে দেবে। কাল সকালেই অপারেশান হওয়ার কথা। এত খুশি এর আগে সে কখনো হয়নি। বার বার আল্লাহকে শুক্রিয়া জানাচ্ছিল।

 কিন্তু কিছুক্ষন পরেই তার মনে একটা চিন্তা উদ্ভুত হল। এই টাকা গুলো চোর গুলো যাদের বাড়ি থেকে চুরি করেছে তাদের কি হবে। নিশ্চয় এই টাকা তাদের দরকারী। এই সব ভাবতে ভাবতে আবার তার মনটা ভারি হয়ে উঠল। সে ভালো করে ব্যাগটা খুজতে লাগল, যদি কোন ঠিকানা পাওয়া যাই। যদি সে তাদের টাকা ফিরিয়ে দেয় তবে তাকে পুরুস্কার স্বরুপ কিছু টাকা নিশ্চয় দেবে। আর সে কিছু ধারও করতে পারে তাদের কাছে। পরে অল্প অল্প করে শোধ করে দেবে। কিন্তু অনেক খোজার পরেও কোন ঠিকানা পেল না। শেষে ভাবল এখান থেকে সত্তর হাজার নিয়ে বাকি টাকা পুলিশকে দিয়ে দেবে। বলবে সে এত টাকায় পেয়েছে। বাকি টাকার কথা যদি কোনদিন জিজ্ঞেস করে সে বলবে জানে না, হয়ত চোরেরা নিয়ে পালিয়েছে।

 এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আব্দুল হাসপাতাল এসে পৌছাল। সোজা গেল ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার বাবু ক্যাশ চেম্বারে টাকা জমা করতে বলল। ক্যাশ চেম্বারে এসে দেখল ওখানে কী নেই। একটা চেয়ারে বসল আব্দুল। সে কতটা খুশি তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একটা পাকে অন্য পায়ের উপর রেখে নাচাচ্ছে। মানুষ যখন আনন্দে থাকে তখনই একমাত্র এই কাজটি করে থাকে। এমন সময় আব্দুলের কানে এল কিছু মানুষের কান্নার করুন আওয়াজ। সে ভাবলো এদের কেউ হয়ত মারা গিয়েছে। তাই শান্তনা দেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল সে তাদের কাছে। কিছুক্ষন থাকার পর সে তাদের কাছে যা শুনল তাতে সে মূর্তির মতো হয়ে গেল। তার শিরদাড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা শ্রোত হয়ে গেল। তার কাছে যে টাকা আছে তা এদেরই। কয়েক ঘন্টা আগেই রাস্তা থেকে ছিন্তাই করে নিয়ে পালায় কিছু চোর। এই টাকা দিয়ে একটি ছোট মেয়ে পায়েলের অপারাশান করাত। তার নাকি অনেক বড় রোগ হয়েছে। অপারেশান করতে দের লক্ষ টাকা লাগবে। তারা গয়না-জমি বিক্রি করে সেই টাকা জোগাড় করেছিল। এখন তারা কি করবে, এখন আর তাদের সাধ্য নাই এত্ত টাকা আবার জোগাড় করার। এদের মধ্যে আব্দুল একজনকে চেনে। গনেশ নাম তার। তিনি খুব দয়ালু এবং ভালো মানুষ। বিপদে পড়লে লোকের সাহায্য করেন। তারই মেয়ে পায়েল।

আব্দুলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এবার কি করবে সে। এই টাকা তাদের দিয়ে দেবে। কিন্তু তাহলে তো তার মেয়ে আয়েষা মারা যাবে। আর যদি না দেয় তাহলে তাদের ফুলের মতো বাচ্চা মেয়ে পায়েল মারা যাবে।আব্দুল কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না। একদিকে তার সংসার অন্য দিকে এত গুলো লোকের কান্না। তার মেয়ে যেমন তার কাছে প্রিয়, ওদের মেয়েও তো ওদের জন্য প্রানের তুল্য। কি করে

 সে অন্যের টাকা দিয়ে, অন্যের মেয়ের জীবন নিয়ে নিজের মেয়েকে বাচাবে। না না এটা তো মহাপাপ।

আব্দুল আবার ফিরে এসে ঐ চেয়ারে বসল। অল্প কিছুক্ষন আগেই সে চেয়ারে বসে আনন্দে পা নাচাচ্ছিল, এখন সেই চেয়ারেই বসে কাঁদছে। নিজের সাথে নিজের লড়াই। সে কি করবে কোন মতেই বুঝতে পারছিল না। ইমাম সাহেবের কাছে সে শুনেছে অন্যের মালের উপর লোভ করতে নেই। অন্যের মালের উপর হস্তক্ষেপ করতে নেই। সে কিভাবে এমনটা করতে পারে! এটা করলে তো সে জাহান্নমি হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই সে ঠিক করল কোন মতেই সে ইমান নষ্ট করবে না। টাকা গুলো ওদের দিল এবং পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল। শুনে সবাই অবাক, তারা খুশিতে আত্মহারা হয়েগেল। সবাই আব্দুলের সাথে গলা মেলাল। ডাক্তাররা এসে পিট চাপরে দিয়ে গেল। পুরো হাসপাতালের সবার মুখেই শুধু তার নাম। তাকে একবার দেখার জন্য হুরোহুরি শুরু হয়ে গেছে।

 হঠাত আব্দুলকে পায়েলের মা বলল, ‘আপনি মানুষ না আপনি ভগবান’। আব্দুল তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলল, একি বলছেন! মানুষকে ভগবানের সাথে তুলনা করছেন!! আমি তো আল্লাহর দাস। সকল প্রশংসা উপরওয়ালার।

 সেই হাসপাতালের এক ডাক্তার মিডিয়াতে খবর দিল। সাংবাদিকরা হুর-মুর করে ঢুকে পড়ল। সব নিউস চ্যানেলে, খবরের কাগজে শুধু আব্দুলের সততার খবর। সরকার ঘোষনা করল আয়েষার অপারেশানের টাকা সম্পুর্ন দিবে। তার সাথে আব্দুলের দুই মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্বও সরকার নেবে। বেশ কয়েকটা সামাজিক সংস্থা আব্দুলের সততার জন্য তাকে পুরুস্কিত করল।

 এদিকে আব্দুলের পাড়ার সকলে মিলে আব্দুলের জন্য একটা নতুন রিক্সা কিনে দিল। কারণ আব্দুল তাদের গর্ব। তার কারণে তাদের পাড়ার কথা হাজারো-লাখো লোক জেনেছি। ক্লাবের ছেলেরা আব্দুলকে ঘারে করে পুরো পাড়া ঘুরালো। কিছুদিন পরে আয়েষা ঠিক হয়ে উঠল। পায়েলের সাথে তাদের পরিবারের লোকরাও আয়েষাকে দেখল। পায়েলের মা বলল এখন থেকে আমার দুটো মেয়ে, পায়েল আর আয়েষা।

আব্দুলকে সব কিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। সে শুনেছে আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন সময় বিপদাপদ ও লোভ দেখিয়ে পরিক্ষা করে। যারা এই ফাদে পা দেই তারা ইমানদার নয়, তারা আল্লাহর পরীক্ষায় ফেল করে। আব্দুল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার পরীক্ষায় পাশ করেছি।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in ইসলাম. Bookmark the permalink.

One Response to :: ইমান ::

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s