রাফ’উল ইয়াদায়েনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ


রাফ’উল ইয়াদায়েন নামাযের একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ। রাফ’উল ইয়াদায়েন শব্দের অর্থ হল দু-হাত উচু করা। নামাযে আল্লাহু আকবার বলার সময় আমরা যখন নিজের দুটি হাতকে কেবলামুখী করে স্বাভাবিকভাবে উচু করি, সেটাকে রাফ’উল ইয়াদায়েন বলে। তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাযে মোট চারবার রাফ’উল ইয়াদায়েন করতে হয়- ১. তাকবীরে তাহরিমার সময় ২. রুকুতে যাওয়ার সময় ৩. রুকু হতে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াবার সময় ৪. তৃতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে বুকে হাত বাধার সময় (সালাতুর রাসুল(সা)/৬৫ পৃষ্ঠা)
রাফ’উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে বহু হাদিস বর্নিত আছে। প্রায় সকল হাদিস গ্রন্থ গুলোতেই এ বিষয়ের হাদিস স্থান পেয়েছে। যেমন, বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি, আবু দাঊদ প্রভৃতি। রাফ’উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে চার খলিফা সহ প্রায় ২৫ জন সাহাবির(রা) বর্নিত সহীহ হাদিস সমূহ রয়েছে। একটি হিসাব মতে রাফ’উল ইয়াদায়েনের হাদিসের রাবি সংখ্যা আশারায় মুবাশশরাহ (অর্থাৎ স্ব স্ব জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত ১০ জন সাহাবী) সহ অনুন্য ৫০ জন সাহাবী(রা) (ফিকহুস সুন্নাহ ১/১০৭; ফাতহুল বারী ২/২৫৮) এবং সর্ব মোট সহীহ হাদিস ও আসারের (সাহাবাদের আদেশ, নির্দেশ ইত্যাদি) সংখ্যা অনুন্য ৪০০ জন (মাজদুদ্দীন ফিরোযাবাদী, সিফরস সা-আদাত/ ১৫ পৃষ্ঠা)। ইমাম সৈয়ুত্বী (রহ) রাফ’উল ইয়াদায়েনের হাদিসকে মুতাওয়াতীর পর্যায়ের বলে মন্তব্য করেছেন (তুহফাতুল আওতাওয়াযী ২/১০০,১০৬)। ইমাম বুখারী বলেন কোন সাহাবী রাফ’উল ইয়াদায়েন না করার তরফ করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। তিনি আরো বলেন রাফ’উল ইয়াদায়েনের হাদিস সমূহের সনদের চেয়ে বিশুদ্ধতম সনদ আর নেই (ফাতহুল বারী, ২/২৫৭)।

রাফ’উল ইয়াদায়েন সম্পর্কে কয়েকটি প্রসিদ্ধতম হাদিস

 ১. আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) হতে বর্নিত- রাসুল (সা) সালাতের শুরুতে, রুকুতে যাওয়াকালীন ও রুকু হতে ওঠাকালীন সময় এবং তৃতীয় রাকাতে দাঁড়ানোর সময়ে রাফ’উল ইয়াদায়েন করতেন (মুত্তাফাক আলাইহি; বুখারি; মিশকাত/৭৯৪)। হাদিসটি বাইহাকিতে বর্ধিতভাবে বর্নিত হয়েছে যে,…রাফ’উল ইয়াদায়েন করতেন ….এভাবে তাঁর নামায জারী ছিল যতদিন না তিনি আল্লাহর সাথে মিলিত হন। অর্থাৎ আমৃত্যু তিনি রাফ’উল ইয়াদায়েন সহ সালাত আদায় করেছেন। ইমাম বুখারির ওস্তাদ আলী ইবনুল মাদীনী বলেন, এ হাদিস আমার নিকট সমস্ত উম্মতের উপর হুজ্জাত বা দলিল স্বরুপ। যে ব্যক্তি এটা শুনবে তার উপরে এটা আলম করা কর্তব্য হবে (সলাতুর রাসুল(সা)। সাহান বসরি ও হামিদ বিন হেলাল বলেন, সকল সাহাবা উক্ত তিন স্থানে রাফ’উল ইয়াদায়েন করতেন (নায়লুল আওতার,৩/১২-১৩; ফিকহুস সুন্নাহ, ২/২৫৭)
২. মালিক বিন হুওয়াইরিস(রা) বলেন, ‘রাসুল(সা) যখন নামাযের জন্য তাকবীর দিতেন, তখন দুটি হাত স্বীয় কান পর্যন্ত ওঠাতেন। একইভাবে তিনি রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে ওঠার সময় অনুরুপ করতেন এবং সামি আল্লা-হু লিমান হামিদা বলতেন’ (মুসলিম/৩৯১)
৩. সালেম(রহ) হতে তাঁর পিতার সুত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দেখেছি যখন রাসুল (সা) নামায আরম্ভ করতেন তখন নিজ কাধ অব্ধি হাত তুলতেন এবং রুকুতে যেতেন এবং রুকু থেকে উঠতেন (তখনো এরুপ করতেন) । ইবনে আবু ওমার তাঁর বর্নিত হাদিসে আরও বলেছেন, কিন্তু তিনি (সা) দুই সিজদার মাঝখানে তা করতেন না (তিরমীযি/২৪২)।
এ হাদিসের ব্যাপারে ইমাম তিরমীযি(রহ) বলেছেন, এ হাদিসটি হাসান সহীহ। এ সম্পর্কে ওমর, আলী, ওয়াইল ইবনে হুজর, মালেক ইবনে হুয়াইরিস, আনাস, আবু হোরায়রা, আবু হুমাইদ, আবু উসাইদ, সাহেল ইবনে সা’দ, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা, আবু কাতাদা, আবু মুশা আশ’আরী, জাবের ও উমার লাইসি (রা) হতেও হাদিস বর্ণিত আছে।
ইমাম তিরমীযি(রহ) আরও বলেন, রাসুলুল্লাহর(সা) একদল বিজ্ঞ সাহাবা যেমন ইবনে উমার, বাজির ইবনে আব্দুল্লাহ, আবু হোরায়রা, আনাস, ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে যোবাইর (রা) ও আরও অনেকে; তাবেঈদের মধ্যে হাসান বসরী, আতা তাউস, মুসাহিদ, নাফে, সালেম ইবনে আব্দুল্লাহ, সাইদ ইবনে যোবাইর (রহ) রুকুতে যাওয়া ও রুকু থেকে ওঠার সময় রাফ’উল ইয়াদায়েন করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইমাম মালেক, মা’মার, আওয়াযী ইবনে উবায়নাহ, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, শাফেয়ী, আহমাদ ও ইসহাক (রহ) এ মত গ্রহন করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক বলেন হাত উত্তলোন সম্পর্কিত হাদিস সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুপ্রমানিত। ইবনে মাসউদ(রা) বলেছেন, রাসুল(সা) কেবল একবার রাফ’উল ইয়াদায়েন করেছেন তারপর আর করেননি এই হাদিসটি প্রমানিত নয় এবং প্রতিষ্ঠিত নয়। আমাকে একথা আহমাদ ইবনে আবদাহ বলেছেন, তিনি ওয়াহাব ইবনে যাম’আর সুত্রে, তিনি সুফিয়ান ইবনে মালেকের সুত্রে এবং তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারকের সুত্রে পেয়েছেন (তিরমীযি শরীফ; হা/২৪২, ১২৭ পৃষ্ঠা)।

রাফা’দায়েন না করার পক্ষে হাদিস

শত শত সহীহ হাদিসের বিপরীতে তাকবীরে তাহরীমা ব্যতিত বাকী সময়ে রাফ’উল ইয়াদায়েন না করার পক্ষে প্রধানত যে চারটি হাদিস পেশ করা হয় তার সব গুলোই যইফ (সলাতুর রাসুল(সা); পৃষ্ঠা ৬৭)। তার মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ(রা) হতে বর্নিত হাদিসটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। যেমন, আলক্বামা বলেন যে, একদা ইবনু মাসউদ(রা) আমাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদের নিকট রাসুল(সা) এর সালাত আদায় করব? এই বলে তিনি সালাত আদায় করেন। কিন্তু তাকবীরে তাহরিমা ব্যতিত আর অন্য জায়গায় রাফ’উল ইয়াদায়েন করলেন না। (তিরমিযী; আবু দাউদ; নাসাঈ; মিশকাত/৮০৯ নং হাদিস)।

  উক্ত হাদিস সম্পর্কে ইবনু হিব্বান বলেন, রাফ’উল ইয়াদায়েন না করার পক্ষে এটিই কুফাবাসীদের সবচেয়ে বড় দলিল হলেও এটিই সবচেয়ে দুর্বলতম দলিল। কেননা  এর মধ্যে এমন সব বিষয় রয়েছে যা একে বাতিল বলে গন্য করে (নায়নুল আওত্বার ৩/১৪; ফিকহুল সুন্নাহ ১/১০৮)। শাইখ আলবানী(রহ) বলেন হাদিসটিকে সহীহ মেনে নিলেও তা রাফ’উল ইয়াদায়েনের পক্ষে বর্ণিত সহীহ হাদিস সমুহের  বিপরীতে পেশ করা যাবে না। কারণ এটি না-বোধক আর ঐগুলি হ্যাঁ-বোধক। ইলমে হাদিসের মুল নীতি অনুযায়ী হ্যা-বোধক হাদিস না-বোধক হাদিসের উপরে অগ্রাধীকার যোগ্য (হাশিয়া মিশকাত (আলবানী) ১/২৫৪ পৃষ্ঠা)। শাহ অলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহেলভি(রহ) বলেন, যে মুসাল্লি রাফ’উল ইয়াদায়েন করে ঐ মুসাল্লি আমার কাছে অধিক প্রিয় ঐ মুসাল্লির চাইতে যে রাফ’উল ইয়াদায়েন করে না। কেননা রাফ’উল ইয়াদায়েনের হাদিস সংখ্যায় বেশি এবং অধিকতর মজবুত (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২/১০)

(অসম্পুর্ন)

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in নামাজ and tagged , . Bookmark the permalink.

2 Responses to রাফ’উল ইয়াদায়েনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

  1. rasel বলেছেন:

    (অসম্পুর্ন) কেন?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s