আব্দুল্লাহ ইবনে হুযায়ফাহ আস-সাহমী


            সাইফুল রনি

আব্দুল্লাহ ইবন হুযাফাহ আস-সাহমী ছিলেন রাসুল (স ) এর খুব কাছের একজন সাহাবী, যিনি রাসুল (স ) এর বার্তাবাহক হিসেবে পরিচিত। তিনি দুইটি ঘটনার জন্য খুবই বিখ্যাত। প্রথমটি, যখন পারস্যের রাজা খসরু এর নিকট রাসুল (স ) এর বার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন আর দ্বিতীয়টি, যখন বাইজান্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াস এর সৈন্যদের কাছে ধরা পড়েন। আজ আপনাদের সাথে দ্বিতীয় ঘটনাটি শেয়ার করছি।

হিজরী নবম বর্ষ। খলীফা উমর (রা ) বাইজান্টাইনদের সাথে যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রেরন করলেন। সে সৈন্যবাহিনীতে আব্দুল্লাহ ইবন হুযাফাহ (রা )ও ছিলেন। মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধের ময়দানে আগমনের  খবর যখন বাইজান্টাইন সম্রাট জানতে পারল, তখন তার সৈনিকদের নির্দেশ দিল কোন মুসলিম যদি ধরা পড়ে তবে যেন জীবিত তার কাছে নিয়ে আসা হয়। কারন সম্রাট সাহাবাদের সম্মন্ধে জানত যে, তারা তাদের বিশ্বাসে কত অটল ছিলেন, তারা কিভাবে দ্বীনের জন্য, রাসুল (স ) এর জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতেন। তাই সে তাদের সাথে কথা বলার জন্য আগ্রহী ছিল।

আল্লাহ ইচ্ছা করলেন, আব্দুল্লাহ ইবন হুযাফাহ (রা ) ধরা পড়বেন। তো ধরা পড়ার পর তাকে  সম্রাটের সম্মুখে নিয়ে আসা হল। সম্রাট আব্দুল্লাহ’র (রা ) দিকে কতসময় তাকিয়ে তাকে দেখল, তারপর বলল, ‘ আমি তোমাকে একটা প্রস্তাব করছি।’

আব্দুল্লাহ: কি প্রস্তাব?

সম্রাট: তুমি যদি খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহন কর তবে তোমাকে আমি ছেড়ে দিব আর তোমাকে সম্মানের সাথে এখানে বাস করতে দিব।

আব্দুল্লাহ: তোমার এই প্রস্তাব থেকে বরং মৃত্যুই আমার কাছে হাজার গুন পছন্দনীয়।

সম্রাট: বুঝতে পারছি, তোমার অনেক সাহস আছে। যাই হোক, যদি তুমি আমার প্রস্তাব মেনে নাও, তবে তোমাকে আমার ক্ষমতার অংশীদার করব এবং যথেষ্ট পরিমান সম্পদের অধিকারী করব।

আব্দুল্লাহ: (তার বাঁধনের শিকল নাড়িয়ে ) আল্লাহর শপথ, যদি তুমি আমাকে তোমার সকল ক্ষমতা আর ধন দৌলত দাও, তবুও আমি এক পলকের জন্যও মোহাম্মাদ (স ) এর দ্বীন ত্যাগ করবনা।

সম্রাট: তাহলে, আমি তোমাকে হত্যা করব।

আব্দুল্লাহ: তোমার যা ইচ্ছা হয় কর।

সম্রাট আব্দুল্লাহকে (রা ) দেওয়ালের সাথে বেঁধে রাখতে বলল। তারপর তার তীরন্দাজকে বলল, ওর পায়ের কাছে, হাতের কাছে তীর ছুড়ে মৃত্যুভয় দেখানোর জন্য। তীরন্দাজ তাই করল, কিন্তু আব্দুল্লাহ (রা ) ছিলেন অনড়। সম্রাট আব্দুল্লাহ’র (রা ) এই দৃঢ়তা দেখে হতাশ হয়ে গেল। সে আব্দুল্লাহ (রা ) কে দেওয়াল থেকে নামিয়ে আনল।

সম্রাট তখন একটি বড় পাত্রে গরম ফুটন্ত তেল আনার নির্দেশ দিল। তারপর অন্য দুইজন মুসলিম বন্দীকে সেই ফুটন্ত তেলে ছাড়তে বলল। তখন আব্দুল্লাহ (রা ) সেখানেই ছিলেন। দুই মুসলিম বন্দীকে ফুটন্ত তেলে যখন ছাড়া হল, বন্দীদের শরীর ঝলসে মাংস গলে কতসময় পরে হাড় ভেসে উঠল। সম্রাট তখন আব্দুল্লাহকে (রা ) আবারো খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহন করার জন্য বলল, তা না হলে তাকেও এভাবে নিঃশেষ করা হবে বলে হুমকি দিল। এটা ছিল আব্দুল্লাহ’র (রা ) জন্য এক চরম ঈমানী অগ্নিপরীক্ষা।  কিন্তু সেই মূহুর্তেও আব্দুল্লাহ (রা ) তার ঈমানের উপর ছিলেন কঠোর। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। সম্রাট হাল ছেড়ে দিল আর হুকুম করল তাকে ফুটন্ত তেলের পাত্রে ফেলে দিতে।

যখন আব্দুল্লাহকে (রা ) নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। সেটা দেখে সম্রাট তো খুশী। এইবার কাজ হয়েছে। তাই সে নির্দেশ দিল তাকে ফিরিয়ে  নিয়ে আসতে।

সম্রাট: তো আব্দুল্লাহ, এবার নিশ্চয়ই তুমি আমার প্রস্তাব গ্রহন করবে?

আব্দুল্লাহ: না।

সম্রাট: ( পুরোপুরি অধৈর্য হয়ে ) তবে কেন তুমি কাদঁছিলে?

আব্দুল্লাহ: আমি কাদঁছিলাম, কারন আমি মনে মনে ভাবলাম, এখন তো আমি আমার এই জীবন আল্লাহর পথে উৎসর্গ করছি, কিন্তু এটা কি যথেষ্ট। আল্লাহ আমাকে কত নিয়ামত দিয়েছেন তার তুলনায় মাত্র একটা জীবন উৎসর্গ করব? আমি আশা করছিলাম, হায়, আমার শরীরে যত লোম আছে ঠিক সেই পরিমান জীবন যদি আমার থাকত, তবে একটার পর একটা এভাবে আল্লাহ’র পথে উৎসর্গ করতাম।

সম্রাট এ কথা শুনে বিস্ময়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেল। সে তখন আব্দুল্লাহকে মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলল, একটা শর্তে যদি সে তার কপালে চুমু খায়। আব্দুল্লাহ (রা ) বললেন, না, তবে যদি সকল মুসলিম বন্দীকে ছেড়ে দেয়া হয়, তবেই  সে কপালে চুমু খাবে। সম্রাট মেনে নিল। এভাবে সকল মুসলিম সৈন্যদের মুক্ত করে নিয়ে আব্দুল্লাহ (রা ) মদীনায় ফিরে গেলেন।

কয়েকটি কথা। এই ধরনের কাহিনী আমরা আসলে সবাই শুনেছি। সেই ১৪০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া কাহিনীগুলো যুগ যুগান্তর পার হয়ে আমাদের কাছে এসেছে। এখন এগুলো শোনার পর আমাদের কি করা উচিত? মনে মনে বললাম, ওয়াও!   তাহলেই হয়ে গেল?

এটাই কি এ ধরনের ঘটনার শিক্ষা?  না। এ ঘটনাগুলো আমাদের ঈমান পরীক্ষার এক একটি মানদন্ড। আমরা এই সাহাবীদের (রা ) সাথে আমাদের জীবন মিলিয়ে আমাদের ঈমানকে মজবুত করব, এই হচ্ছে এ ঘটনাগুলোর উদ্দেশ্য। আল্লাহ এই দ্বীন ইসলামের প্রাথমিক যুগে যত ঘটনাই ঘটিয়েছেন, সব ছিল আমাদের জন্য শিক্ষাস্বরূপ। তাই আসুন, আমরা আমাদের জীবনে ইসলামের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাই।

আমাদের সবসময় মনে রাখা উচিত, আব্দুল্লাহ’র (রা ) ঘটনার সময়ও আল্লাহ ছিলেন এবং তিনি দেখেছেন আর এখনো আল্লাহ আমাদের দেখছেন। আমরা কেউই তার সীমার বাইরে নই।

আল্লাহ আমাদের হিদায়াত করুন

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in ইসলাম. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s