ইসলামের দাসপ্রথা নিয়ে নাস্তিকদের আপত্তি ও আমার কিছু কথা


        লেখক – মুহাম্মাদ ইসহাক খান

    ইসলামের উপর নাস্তিক দেরযেই সকল বিষয়ে আপত্তি তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, : ইসলাম দাস প্রথা বহাল রেখে অন্যায় করেছে। আমার বক্তব্য হচ্ছে, -ইসলাম পূর্ব জাহেলী সমাজে দাসী-বাদীদের সাথে কি রূপ আচরণ করা হতো আর ইসলাম এসে এ ব্যাপারে দাসী-বাদীদের সাথে কিরুপ আচরণে মুসলমানদেরকে অভ্যস্ত করেছে- এই দুইটি বিষয়ের পাশাপাশি বিশ্লেষণে আমাদের নাস্তিক ভাইরা সম্ভবত: খুব অস্বস্তি বোধ করেন। এই দিকটাতে তারা সহজে আসতে চান না। কারণ এখানে এলেই দেখা যাবে যে, একমাত্র ইসলামই এমন এক দীন বা জীবন ব্যবস্থা যা দাসী-বাদীদেরকে পশুত্বের মতো নির্যাতন-নিপীড়ণ, কষ্ট ও লাঞ্চনাকর জীবন-যাপন থেকে মুক্ত করে মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্য কোন ধর্ম বা আদর্শ যার
সামান্যও করতে পারে নি। এই বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে তারা আসলে এবিষয়টিতে মৌন সমর্থন দিয়ে থাকেন (যা ছাড়া তাদের অন্য কোন গত্যান্তরও নেই)। এরপর তাদের আপত্তি আসে যেখানে তা হলো, ইসলাম তাহলে দাস প্রথা বাতিল করলো না কেন?

আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলে– এক্ষেত্রে দু’টি বিষয় লক্ষণীয়:

১) দাস প্রথা বহাল থাকা টা যুদ্ধবন্দীদের জন্য বেশী উপকারী না দাস প্রথা বাতিল করা?

২) দাস প্রথা কি ইসলামের সেই সকল বিধানের অন্তর্ভুক্ত যা ইজমা-কিয়াসের দ্বারা রহিত করা যাবে না?

প্রথম বিষয়ঃ  অর্থাৎ দাস প্রথা বহাল থাকা টা যুদ্ধবন্দীদের জন্য বেশী উপকারী না দাস প্রথা বাতিল করা?

এটা বোঝার জন্য আসুন আমরা একটু ভেবে দেখি যে দাস প্রথা যদি ইসলাম বাতিল করতো তাহলে তখন কি হতো?

   আমরা জানি যে, যুদ্ধের ঘটনা কোন আনন্দময় ফুটবল-ক্রিকেট খেলা নয় -যেখানে বিজয়ী এবং বিজীত উভয় দলই খেলা শেষে সহি-সালামতে নিজ নিজ ঘরে ফিরতে পারে। বরং যুদ্ধ হলো বিবদমান দু’টি পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ-ঘৃণা আর রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার নাম। এজন্য যুদ্ধের ময়দানে প্রতি পক্ষের উপর দয়া-মায়া বলে কিছু থাকে না। এখন এমন একটি যুদ্ধে যেই দলটি অনেক কষ্টে বিজয়ী হয় তাদের মনে প্রতিপক্ষকে চূড়ান্তভাবে নির্মূল করে দেয়ার আগ্রহটাই বেশি সক্রিয় থাকে। যার কারণে দেখা যায় মুসলিমদের উপর বিজয়ী অনেক যুদ্ধেই অমুসলিমরা যুদ্ধশেষে গণহত্যার ভয়াবহ তান্ডবলীলা চালিয়ে ছিলো -আজও চালাচ্ছে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ স্পেন-ফিলিস্তিন-ইরাক-আফগানিস্তান ইত্যাদি।

  মুসলিম সৈন্যরাও মানুষ। তাদের মধ্যেও মানবিক রাগ ক্রোধ আছে। এখন যদি তাদের সামনে দাস প্রথা বাতিল
করা হতো তাহলে যুদ্ধের পর পরাজিত অমুসলিমদের জীবিত থাকাটাই হয়তো দুস্কর হয়ে যেতো স্বাভাবিক কারণেই। কারণ অমুসলিমদের বাচিয়ে রেখে কি হবে? বিজয়ীদের তো কোন লাভ হচ্ছেনা পরাজিতদের দ্বারা। ফলে তাদের মৃত্যু হতো প্রায় নিশ্চিত।

পক্ষান্তরে যখন তাদেরকে বলা হলো, দাস প্রথা আছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা অহেতুক অমুসলিম হত্যা এড়িয়ে চলতে লাগলো। ফলে প্রাণহাণীও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলো। মুসলিমদের শাসনামলে (৬২২-১৯২৪) অমুসলিমদের হত্যার সংখ্যা শুনলে আপনারা নি:শন্দেহে আশ্চর্য হয়ে যাবেন। যে এতো কম ছিলো!

বর্তমান এক ইরাক-আফগান যুদ্ধের একশতভাগের একভাগ লোকও সেই ১৩০০ বছরে নিহত হয়নি।

দ্বিতিয়ত: দাস প্রথা বাতিল করলে যদি অমুসলিমরা বেঁচেও থাকতো তদুপরি তাদের সহায়-সম্বলহীন, আত্মীয়-পরিজন ছাড়া নি:স্বঙ্গ জীবন মৃত্যুর চেয়েও কষ্টকর হতো।

 সবচেয়ে বেশি সমস্যা হতো মহিলা ও নারী বন্দীদের জীবনে। যাদের নিয়ে আপনারা (নাস্তিকরা) এখন বেশি চিন্তা করছেন। শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ মহিলাকেই বাধ্য হয়ে পতিতাবৃত্তিতে নেমে আসতে হতো অন্ন-বাসস্থানের ব্যবস্থা করার জন্যই। অথচ এই সকল সমস্যা যেনো না হয় সেজন্যই হয়তো ইসলাম দাস প্রথা বাতিল করেনি। কেননা দাস প্রথার মাধ্যমে অধিনস্তদের দায়-দায়িত্ব ইসলাম মুসলিম মনিবদের উপর অর্পন করেছে। মনিবের ঘরে
দাস-দাসী তার আহার এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা পেয়েছে। এরপর ইসলাম তাদেরকে আযাদ
করার উপর মুসলমানদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলে তারা স্বাধীনও হতে পেরেছে।

 আর যদি কোন মনিব তার দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক করে তাহলে ইসলাম তাকে অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু নিজের প্রয়োজন সেরে ভেগে পড়ার সুযোগ দেয়নি। বরং দাসীর গর্ভে সন্তান হলে তাকে নিজের সন্তানের মতোই সম্পদের মালিকানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অধিকার দিয়েছে ইসলাম। আর যেই দাসীর গর্ভে মনিবের সন্তান হবে সেই দাসীকেও নাম দিয়েছে -উম্মে ওয়ালাদ বা বাচ্চার মা। এবং এমন দাসীকে বিক্রি করাও নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম।

   অর্থাৎ একে বৈবাহিক সম্পর্কের কাছাকাছি একটি সম্পর্কের স্বীকৃতি দিয়ে এর সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে ইসলাম। এভাবে ইসলাম দাস প্রথা বহাল রাখার ফলে মূলত: যুদ্ধবন্দী ও অমুসলিমরাই বেশি লাভবান হয়েছে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেচে গেছে, নিশ্চিত ও নিরাপদ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছে এবং এক সময় আজাদ তথা
স্বাধীনও হয়েছে।

   এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয়: আচ্ছা ইসলাম যদি দাস প্রথা বাতিল করতো আর অমুসলিমরা যদি বাতিল না করে বহাল রাখতো তাহলে কি হতো?

তখন মুসলিমরা বন্দী হতো, নির্যাতিত হতো, তাদেরকে আর বন্দী-বিনিময়ের মাধ্যমে ফিরিয়েও আনা যেতো না। পক্ষান্তরে কাফিররা পরাজিত হলেও ফিরে যেতো এবং আবার ইসলামের বিপক্ষে অস্ত্র নিয়ে মুসলিম নিধন শুরু করতো।

  এবার আসুন আমরা দ্বিতীয় বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেই। আর তা হলো:  দাস প্রথা কি ইসলামের সেই সকল বিধানের অন্তর্ভুক্ত যা ইজমা-কিয়াসের দ্বারা রহিত করা যাবে না?”

   কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও আমি এমনটি পাই নি যে, দাস প্রথা অবশ্য
অবশ্য পালনীয় বিধান। কোনমতেই এটি রহিত করা যাবে না। বরং কুরআন ও হাদীসে যা আছে তা হলো, দাস আসলে তার সাথে কিরূপ ব্যবহার করতে হবে তা। (এখানে লক্ষণীয় কুরআন এবং হাদীসের শক্তিশালী তাকিদ বাক্য আমর জাতীয় শব্দের দ্বারা ইসলামের অবশ্য অবশ্য পালনীয় বিধান সাব্যস্ত হয়) যদি আমার নাস্তিকভাইরা এমন কোন আয়াত বা হাদীস পান তাহলে আমাকে জানাবেন আশা করি।

    এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, এই বিধানটি ইজমা ও কিয়াসের আলোকে পুন:বিবেচনা যোগ্য। এজন্য বর্তমানে অনেক ইসলামী স্কলারগণ দাস প্রথা রহিত হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইসলামী সরকার ব্যবস্থা থাকলে খলীফা মজলিসে শূরার পরামর্শক্রমে এধরণের সাধারণ বিষয় রহিত করতে পারেন।

                           ::             ::                ::                 ::                 ::

   :: :: দাস প্রথা বাতিলের কারণে বর্তমান যুদ্ধ-বিগ্রহ সমূহে বিপরীত পক্ষকে সমূলে নিধন বেড়ে গেছে। কারণ এখন যুদ্ধের পর বন্দী থাকাটাই সমস্যা। তাদের পানা-আহারের ব্যবস্থা করতে হবে। আবার এক সময় ছেড়ে দিতে হবে। তার চেয়ে তাদেরকে সমূলে হত্যা করারই বর্তমান সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য সহজ। তাই তো আজকের ইরাক-আফগানিস্তান ইত্যকার এক একটি যুদ্ধেই লক্ষ-লক্ষ মানুষ নিহত হচ্ছে। আজ যদি দাস প্রথা থাকতো, তাহলে এতো মানুষ মারা যেতো না। কারণ তাদেরকে কাজে লাগানো যাবে ভেবে, জীবিত রাখতো। যেমনটি রাসূল সা. ও তার পরবর্তী যুগে হতো।

   যার ফলে আমরা দেখতে পাই যে, মহানবী সা· তাঁর দশ বছরের সামরিক জীবনে প্রায় ৩০ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অথচ এই বিশাল এলাকা জয় করতে সকল যুদ্ধে মুসলমানরা সর্বমোট ২৫১ জন কাফির সৈন্য হত্যা করেছেন। আর মুসলমানদের মধ্যে শাহাদাত বরণ করেছেন সর্বোচ্চ ১২০ জন।

   পৃথিবীর শুরু থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া অনৈসলামিক যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস তন্ন তন্ন
করে খঁুজলেও এত বিশাল এলাকা বিজয়ের জন্য এত কম সংখ্যক প্রাণহাণীর অন্য কোন নযীর
খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

লেখক পরিচিতিঃ লেখক ছদ্মনামে লেখেন। তাঁর ছন্দ নাম মাই নেম ইস খান। ভালো নাম মুহাম্মাদ ইসহাক খান। তিনি বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করেন। ‘জাকির নাইক ও আমরা’ নামে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। যা অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

Advertisements

About সম্পাদক

সম্পাদক - ইসলামের আলো
This entry was posted in ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা and tagged , , , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

3 Responses to ইসলামের দাসপ্রথা নিয়ে নাস্তিকদের আপত্তি ও আমার কিছু কথা

  1. Syful বলেছেন:

    ছন্দনাম> ছদ্মনাম

  2. mmk27 বলেছেন:

    ধন্যবাদ, আপনার সুন্দর লেখার জন্য। নাস্তিক ভাইয়েরা নিশ্চয় তাদের ভুল বুঝতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালার তাউফিক কামনা করচ্ছি। যাযাকাল্লাহু খাইরান…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s